বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলের তিনটি গ্যালারিতে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫২০ টাকা ব্যয়ে ২৪টি এসি স্থাপন করা হয়েছে। এসব এসি চালাতে অতিরিক্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন দেখিয়ে এবার ৩ হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার নতুন একটি সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৪১ টাকা। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটিতে ইতোমধ্যে ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি সাবস্টেশন চালু থাকার পরও এত বড় ক্ষমতার নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব কেন করা হলো তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যমান সাবস্টেশনের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করা হলে নতুন এসিগুলোর লোড সামলানো সম্ভব হতো।
তাঁর মতে, নতুন করে ৩ হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশনের প্রয়োজনীয়তা প্রস্তাব করার আগে কলেজের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা, বর্তমান লোড এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের সুনির্দিষ্ট হিসাব করা প্রয়োজন ছিল। এদিকে শুধু সাবস্টেশন নয়, অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ প্রকল্পে জেনারেটর সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠিত হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ বিষয়ে জানতে কয়েকবার ফোন দিলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করেননি।
বগুড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩ হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার নতুন সাবস্টেশন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার ৭৪১ টাকা। অথচ তিনটি গ্যালারিতে ২৪টি এসি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫২০ টাকা। অর্থাৎ এসি স্থাপনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, প্রস্তাবিত সাবস্টেশনের ব্যয় তার প্রায় নয়গুণ। আবার বিদ্যমান ৫০০ কিলোওয়াট সাবস্টেশনের সঙ্গে ৫০০ কিলোওয়াট সক্ষমতা বাড়ালেই প্রয়োজনীয় লোড মেটানো সম্ভব। শজিমেকের কয়েকজন শিক্ষকও ৩ হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এত বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা দরকার।
নতুন সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন খোদ শজিমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াদুদুল হক তরফদার। গত ১৫ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। চিঠিতে অধ্যক্ষ অভিযোগ করেন, গত ২৩ জুন নতুন সাবস্টেশনের প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সময় তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি। পরে ওই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই-জিপি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে ২৫০ কিয়োওয়াট ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহের কথা ছিল। এ জন্য বরাদ্দ ছিল ৯ লাখ টাকা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তবে সেখানে ১২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার জেনারেটর সরবরাহ করা হয়েছে।
অর্থাৎ দরপত্রে নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে ১৩০ কিলোওয়াট কম ক্ষমতার জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং দরপত্রের শর্ত মানা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্তে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে উৎপাদিত জেনারেটরের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছে চীনে তৈরি জেনারেটর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুরু হওয়া অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও এসব অভিযোগের কারণে এখনো ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি।
এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাসুমা বেগম ই-জিপি শর্ত না মেনে কেন কম ক্ষমতার এবং চীনে তৈরি জেনারেটর সরবরাহ করেছে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উল্লেখ্য, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রয়াত সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের ছেলে ও বগুড়া চেম্বারের সাবেক সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাসুমা বেগম। তবে প্রয়াত মমতাজ উদ্দিনের পরিবারের পক্ষে জানানো হয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের হলেও কাজ করেছেন অন্য ঠিকাদার। এক্ষেত্রে শুধু তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বগুড়া গণপূর্ত বিভাগের সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ওই সময় ক্ষমতাসীন দলের দাপটে তাঁকে জোর করে এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
শুধু মিলন নয়, আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে খাবার ও ওষুধ সাপ্লাই, নির্মাণকাজ, সংস্কার কাজ করেছেন। এ কাজে তাঁরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। বগুড়া গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হক বলেন, তিনি বগুড়ায় যোগ দিয়েছেন কয়েক মাস আগে। এসি স্থাপন, জেনারেটর সরবরাহ কিংবা নতুন সাবস্টেশনের প্রস্তাবের প্রাক্কলন, সবই তাঁর যোগদানের আগের সময়ে হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনা করে হয়তো ৩ হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতার সাবস্টেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।