এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরেও বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সুযোগসন্ধানী আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা এলপিজি এমন কারসাজিতে জড়িত বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সিন্ডিকেটের দাপটে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদার ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার টাকা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
জানা গেছে, আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, যমুনা-এই পাঁচ এলপিজি কোম্পানি বিক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে। অতিরিক্ত টাকা দিতে না চাইলে বলা হচ্ছে গ্যাসের সরবরাহ নেই। সিন্ডিকেট সদস্যরা গ্যাসের পরিমাণভেদে অন্যান্য সিলিন্ডারের দামও বাড়িয়েছে একই অনুপাতে। এদিকে মজুত ও আমদানি চেইন স্বাভাবিক থাকার পরেও সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় হাজার টাকা বৃদ্ধি হওয়ায় ক্রেতাদের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের’ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
এর আগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে কিংবা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল মন্ত্রণালয়। কিন্তু সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাঁচ কোম্পানির সিন্ডিকেট দাপট দেখিয়েই যাচ্ছে। অথচ গতকালও সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এসেছে এলএনজির নতুন কার্গো। এর আগে সেপ্টেম্বরেও বিভিন্ন উৎস থেকে একাধিক এলএনজি কার্গো দেশে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ওই পাঁচ কোম্পানির বিরুদ্ধে মজুতের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা আমদানি করা এলপিজি বাজারে ছাড়েনি। স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি মজুত রাখা হয়ে থাকতে পারে। ফলে দেশের অনেক এলাকায় বর্তমানে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ২ হাজার টাকার বেশি দিতে হচ্ছে।
এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। আমদানি করা এলপিজি বাজারে না ছাড়ার অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অক্টোবর থেকে বাজারে প্রতি টনে মার্কেট প্রিমিয়াম প্রায় ৬৪ ডলার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এর সময় মিলে যাওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজি ইচ্ছাকৃতভাবে মজুত রেখে দাম সমন্বয়ের পর বাজারে ছাড়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এমন ঘটনা প্রমাণিত হলে তা আমদানিকারকদের বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ সীমিত করে দাম বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। আর সরবরাহব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে থাকা অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাড়তি দামের চাপ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ চাপ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমস্যা তৈরি করছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছে।
এনএসআই প্রতিবেদনে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুত জরুরিভাবে নিরীক্ষার অনুরোধ করা হয়েছে। এজন্য আমদানিকারকভিত্তিক এলপিজির চালান, খালাস, সংরক্ষণ, মজুতের পরিমাণ ও প্রকৃতপক্ষে বাজারে ছাড়ার তারিখের তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছে। অক্টোবরে প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজির কতটুকু দাম সমন্বয়ের পরও বাজারে ছাড়া হয়নি, তা নির্ধারণ করতেও বলা হয়েছে। বাড়তি প্রিমিয়াম বা বাজারদর পাওয়ার আশায় কোনো আমদানিকারক কিংবা বাজারসংশ্লিষ্ট অন্য কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এলপিজি বাজারে ছাড়তে দেরি করেছেন কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মজুতের পরিমাণ স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রয়োজন ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা মূল্যায়নেরও অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক সরবরাহ সীমিত করেছে বা অস্বাভাবিক দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত আমদানি করা এলপিজি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেও সরকারকে তাগিদ দিয়েছে তারা।
সংস্থাটি বলছে, অতিরিক্ত মজুত ধরে রাখার মাধ্যমে যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি বা বাজারের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা না যায়। এদিকে কৃত্রিম সংকটের অবসান ঘটাতে সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। এক বিবৃতিতে লোয়াব বলেছে, এলপিজি আমদানি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সেপ্টেম্বরে যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে, তা চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই। লোয়াব সতর্ক করে বলেছে, বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বা অনুমোদনহীন মজুত করলে অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।