বাংলামোটর মোড় এলাকায় একটি ক্লাব ছিল বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমনের। টার্গেটেড ব্যক্তিদের ওই ক্লাবে নিয়ে যেতেন সাইমন ও তার সঙ্গীরা। টাকা না দিয়ে কেউ বের হতে পারতেন না। সাইমনের প্রভাব মূলত বাংলামোটর ও আশপাশের এলাকাকেন্দ্রিক। তার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ছিল স্থানীয়রা। বৃহস্পতিবার চাঁদা না পেয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে একই এলাকার মো. সোহান নামের এক যুবকের মাথা ফাটিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালাতে না পেরে একটি ভবনে ঢুকে পড়েন। এ সময় স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে তাকে ঘেরাও করেন। জ্বালিয়ে দেন তার মোটরসাইকেল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ ও এসআরবি’র সদস্যরা। রাতেই তাকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল তাদের আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে পাঠানো হয়।
সূত্র জানিয়েছে, এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে সাইমন নিয়মিত চাঁদা নিতেন। একেকটি দোকান থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা নিতেন বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। চাঁদা না দিলেও হুমকি-ধমকিও দিতেন তিনি। অভিযোগ, ৫ই আগস্টের পর ওই এলাকায় একটি ক্লাব দখল করে সেখানে বসতেন সাইমন। সেখানে ব্যবসায়ী বা টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে বসিয়ে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন। শুক্রবার রাতে এলাকাবাসী তার ওই ক্লাবঘরটি ভেঙে দেয়। এলাকাবাসী জানায়, এই ঘরটি স্থানীয় অন্য একজনের। তবে সাইমন সেই ঘর নিজের দখলে নিয়ে যায়। সেখানে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছবি টানিয়ে দেয়। পরে তাদের ছবি সরিয়ে রেখে ওই ঘরটি পুনরায় দখলমুক্ত করে এলাকাবাসী।
একাধিক স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলামোটর, দিলুরোডসহ স্থানীয় বিভিন্ন দোকানপাট, ফুটপাথের ছোটখাটো দোকান থেকেও চাঁদা আদায় করতেন সাইমন। বাংলামোটর মোড়ের মসজিদ গলিতে সাইমনের একটি গ্যাসের দোকান আছে। সেখান থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য করানো হয় বলেও স্থানীয় কোনো কোনো ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।
স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার বলেন, মানুষ চাইলেই কিছু বলতে পারে না। চাঁদা না পেলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে সাইমন। একেকজন দোকানদার থেকে ১৫ হাজার থেকে শুরু করে যার কাছে যত বেশি পারে নিয়ে নিতো। স্থানীয় আরেকটি ফাস্টফুডের দোকানদার বলেন, আমরা ফোনকল করলেই গ্যাস দিয়ে যায়। কিন্তু খরচ অন্য দোকান থেকে অন্তত দেড়শ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা বেশি নেয় সাইমন। বিশেষ করে বাইরে থেকে এসে যারা ব্যবসা করতে চায় তাদের একরকম বাধ্য করা হয় তার কাছ থেকে গ্যাস কিনতে।
কি ঘটেছিল বৃহস্পতিবার রাতে?
মূলত চাঁদা না দেয়াকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। ভুক্তভোগী সোহানের ডেন্টাল শপে চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে। সাইমন ও সোহানের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সোহানের মাথায় আঘাত করেন সাইমন। এতে সোহান আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তার ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ ওই এলাকার বাসিন্দারা বাংলামোটরের রূপায়ণ টাওয়ারের উত্তর দিকের গলিতে জমায়েত হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং হামলাকারীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোহানকে আঘাত করার পর একপর্যায়ে সাইমন দুটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে সাইমন তার সহযোগীদের নিয়ে একটি ভবনে ঢোকেন। তখন বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দারা গলিতে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করছেন। তাদের একজনকে বলতে শোনা যায়, বহিষ্কৃত যুবদল নেতা সাইমন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি করছেন। তাকে চাঁদা না দিলে তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে স্থানীয়দের ওপর হামলা চালান।
কেউ তার কথামতো না চললে তাকে মারধর করা হয়।
শুক্রবার বিকালে আহত সোহান মানবজমিনকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, সাইমনের সঙ্গের আমার ভাই-ব্রাদার সম্পর্ক ছিল। গতকাল রাতে সে আমাকে হঠাৎ ঢেকে নিয়ে বলে, “বেশি বাইড়া গেছস না?” তখন আমি বলি, কী করবি মেরে ফেলবি? সাইমন তখন আমার বুকে অগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে হুমকি দেয়। একপর্যায়ে সে আমাকে অগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আঘাতে করে রক্তাক্ত করে। এরপর আমি স্থানীয় দোকানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যাই চিকিৎসার জন্য। ঘটনার কারণ জানতে চাইলে সোহান বলেন, মূলত এলাকায় আমার ডেন্টাল চিকিৎসালয় ছিল। সেখানে সাইমনের এক অনুসারী এসে চাঁদা দাবি করে। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম কে পাঠিয়েছে? তখন ওই অনুসারী বললো, সাইমন পাঠিয়েছে। তখন আমি সাইমনকে কল দিলে সে জানায়, সে জানতো না ওই দোকান যে আমার। ভুল করে পাঠিয়েছে। সোহান বলেন, মূলত সে টাকা খেতে পারেনি ওই ক্ষোভ থেকে এই কাজ করেছে। এই ঘটনায় আমি বাদী হয়ে মামলা করেছি থানায়।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে তারা সাইমনের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। আমরা চারজনকে আমাদের হেফাজতে নিয়ে এসেছি।
যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল মিরাজ বলেন, ফেরদৌস আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মানুষকে তটস্থ করে রেখেছিলেন। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে হাতিরঝিল থানা যুবদলের আহ্বায়কের পদ থেকে তাকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে।
রিমান্ডে সাইমন ও ৩ সহযোগী: মারধর ও গুলি ছোড়ার অভিযোগে করা মামলায় ফেরদৌস আহমেদ সাইমনসহ চারজনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সাইমনকে চারদিন এবং অপর তিন আসামিকে তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শুক্রবার বিকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালত সূত্রে জানা যায়, রিমান্ড শুনানির সময় আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। রিমান্ডে যাওয়া অপর তিন আসামি হলেন ওমর (৩২), মোর্শেদ (২৫) ও মো. শাওন (২৫)।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক মো. নাসিম চার আসামিকে আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পুলিশের আবেদনে বলা হয়, ঘটনার সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং মামলার সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ধারের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। মামলার এজাহার ও রিমান্ড আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে বাংলামোটরের নিউ ইস্কাটন এলাকায় একটি বাসার সামনে মো. সোহানের পথরোধ করেন আসামিরা। এ সময় সাইমন তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।