দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ পরিস্থিতির পর অক্টোবরের শুরুতেও প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়ও বাড়ছে রোগীর চাপ। বিশেষ করে খুলনা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, ঝালকাঠি জেলা এখন ডেঙ্গু আক্রান্তের হটস্পট হয়ে উঠেছে।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেঙ্গুকে আর ঢাকা শহরের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, ময়মনসিংহ, ঝালকাঠি, গাজীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা, কুমিল্লা, বান্দরবান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, যশোর, নরসিংদী, চাঁদপুর ও মানিকগঞ্জসহ আরও অনেক জেলায় সংক্রমণ রয়েছে। তাই রাজধানীকে কেন্দ্র করে তৈরি করা একটি পরিকল্পনা দিয়ে পুরো দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন জেলা ও উপজেলাভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় কোন ধরনের প্রজননস্থল বেশি, কোন মৌসুমে ঝুঁকি বাড়ে, কোন কীটনাশক কার্যকর এবং কোথায় কীটনাশক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঢাকার জন্য যে কৌশল কার্যকর, সেটি প্রত্যন্ত জেলার জন্যও একইভাবে কার্যকর হবে- এমন ধারণা বৈজ্ঞানিক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৬৩ জন, মারা গেছেন একজন। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮২ হাজার ৭৬১ জন, মারা গেছেন ২৫০ জন। সেপ্টেম্বরের মতো অক্টোবরেও বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত মাসে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে ১৫ জেলায় ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে-ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী।
আইইডিসিআরের ক্লাইমেট-ইনফর্মড আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড রেসপন্স সিস্টেম বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নরসিংদী, যশোর, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও রাজশাহী জেলাকেও ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা দেশে এডিস মশা নির্মূল করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সব ধরনের কীট, ওষুধ, স্যালাইন মজুত রয়েছে। জ্বর আসলে দেরি না করে টেস্ট করতে হবে এবং ডেঙ্গু শনাক্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। দেরি করলে জটিলতার শঙ্কা বাড়ে।’
ঢাকার বাইরে বাড়ছে রোগী : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১ অক্টোবরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রতিবেদনে জেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার হু হু করে বাড়ছে। খুলনা জেলায় মোট ৪ হাজার ৮০৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুধু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ বছর ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৫৮৬ জন ডেঙ্গু রোগী। এই বিভাগে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৮১ জন। বিভাগটিতে এ পর্যন্ত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
খুলনা শহরও হটস্পট হিসেবে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বরিশাল বিভাগেও ডেঙ্গুর চাপ উদ্বেগজনক। ১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগটিতে মোট ১০ হাজার ৭৮৯ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বিভাগে এ পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল জেলায় মোট ভর্তি ২ হাজার ২৮৩ জন; পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৬৩৭, পিরোজপুরে ২ হাজার ৭৩৯, বরগুনায় ১ হাজার ৪২৯ এবং ঝালকাঠিতে ২ হাজার ১৬ জন ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগের মধ্যে পিরোজপুর এখন বিশেষ নজরে রাখার মতো। ১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলাটিতে ২ হাজার ৭৩৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগেও সংক্রমণের বিস্তার স্পষ্ট। ১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগটিতে মোট ১২ হাজার ১৬৬ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিভাগটিতে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। চট্টগ্রাম জেলায় মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ২৪৭ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৮০ জন। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে কক্সবাজার, চাঁদপুর ও ফেনীতে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।
ময়মনসিংহ বিভাগে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। ১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগটিতে ৪ হাজার ৫২৯ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। ময়মনসিংহ জেলার মোট ভর্তি ৩ হাজার ২৩১ জন। রাজশাহী বিভাগেও কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। বিভাগটিতে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৪১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজশাহী জেলায় মোট ভর্তি ৯৯০ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ হাজার ৪৬৫ এবং সিরাজগঞ্জে ১ হাজার ৩৬৭ জন। ঢাকার বাইরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও রোগীর চাপ রয়েছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত গাজীপুর জেলায় মোট ৩ হাজার ২৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে মোট ভর্তি ১ হাজার ৭৫৮ জন। নরসিংদীতে মোট ভর্তি ১ হাজার ৩৭০ জন।