Image description

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও গভীরভাবে মেরুকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল কেবল সরকার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে নতুন নীতিগত, আদর্শিক ও প্রশাসনিক নির্দেশনার আওতায় আনার জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ক্ষমতা গ্রহণের পর একটি নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনকে প্রায়শই অদৃশ্য, প্রাতিষ্ঠানিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে থাকা পূর্ববর্তী সরকারের সুবিধাভোগী অংশের অসহযোগিতা, ফাইল আটকে রাখা, তথ্য পাচার বা সুপরিকল্পিত অন্তর্ঘাত (Sabotage)-এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা।

অতীতের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের অভিজ্ঞতা, কিংবা সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার নজিরবিহীন প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলোকে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ ও অন্তর্ঘাতের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাতের তাত্ত্বিক কাঠামো: ‘ডিপ স্টেট’ ও ‘স্পয়েলস সিস্টেম’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন কোনো রাষ্ট্রের সিভিল সার্ভিস বা সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র নির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে, তখন তাকে ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) বা রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র বলা হয়। বাংলাদেশে এই ডিপ স্টেটের উদ্ভব ঘটেছে মূলত ‘স্পয়েলস সিস্টেম’ (Spoils System) বা রাজনৈতিক আনুকূল্যের মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতির সংস্কৃতির কারণে।

যখন একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে নিজেদের লোক বসায়। সরকার পরিবর্তন হলেও এই আমলারা রাতারাতি পরিবর্তিত হন না। তারা নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়নে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেন, যাকে প্রশাসনিক পরিভাষায় ‘ম্যালিসিয়াস কমপ্লায়েন্স’ (Malicious Compliance) বলা হয়। অর্থাৎ, তারা সরাসরি নির্দেশ অমান্য করেন না, কিন্তু আইন ও নিয়মের অজুহাত দেখিয়ে কাজ এত ধীরগতিতে করেন যে, প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।

২০০১-২০০৬ মেয়াদ: অন্তর্ঘাত এবং প্রশাসনিক টানাপড়েন

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের নগ্ন দলীয়করণের একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল ১৯৯৬ সালের ‘জনতার মঞ্চ’-এর মাধ্যমে, যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিলেন। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা এমন এক প্রশাসনের মুখোমুখি হয়, যার একটি বিরাট অংশ ছিল পূর্ববর্তী সরকারের আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী। সেই সময়কালে বিএনপি সরকারের নীতি বাস্তবায়ন পদে পদে বাধাগ্রস্ত হওয়ার একাধিক অভিযোগ ওঠে।

বিদ্যুৎ খাতের ভৌত অন্তর্ঘাত: সে সময় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তীব্র অভিযোগ করা হয়েছিল যে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ইন্ধনে প্রশাসনের একটি অংশ এবং কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করছে। ট্রান্সফরমার বিকল করা, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে নাটবল্টু খুলে নেয়া বা তার কেটে ফেলার মতো ঘটনাগুলোকে নিছক চুরি নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক স্যাবোটাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

তথ্যভিত্তিক বাস্তবতা ও টিআইবি রিপোর্ট: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্যাবোটাজের অভিযোগটি পুরোপুরি অমূলক ছিল না। স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক ইন্ধনে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল।

নীতিগত ব্যর্থতা ও স্যাবোটাজের মিশ্রণ: ২০০১-২০০৬ মেয়াদে, যখন কোনো সরকারের নিজস্ব নীতিগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতি থাকে, তখন প্রশাসনের ভেতরে থাকা ‘অদৃশ্য শত্রু’ সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে খুব সহজেই জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।

১৫ বছরের একমুখী প্রশাসন (২০০৯-২০২৪): রাষ্ট্রযন্ত্রের নিখুঁত দলীয়করণ

২০০১ সালের চেয়ে ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বহুগুণ জটিল। গত দেড় দশক (২০০৯-২০২৪) ধরে দেশে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিরবচ্ছিন্ন শাসন কায়েম ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান-সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, বিচার বিভাগ, এমনকি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে-মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জাল: বিগত দেড় দশকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মেধাবীদের পদোন্নতি বঞ্চিত করে রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এর ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট অলিগার্ক বা সুবিধাভোগী শ্রেণির সৃষ্টি হয়।

মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক ক্যাডার: জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এমন এক কর্মকর্তা শ্রেণি তৈরি করা হয়, যাদের প্রধান কাজ জনসেবার চেয়ে দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে দাঁড়ায়।

আর্থিক ও বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত: ব্যাংক লুটেরা, জ্বালানি খাতের মাফিয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটগুলোর সঙ্গে এই আমলাতন্ত্রের একটি অংশের গভীর অর্থনৈতিক যোগসূত্র গড়ে ওঠে।

ড. ইউনূসের আমল: প্রশাসন অকেজো করার ব্লু-প্রিন্ট ও নথিপত্র ধ্বংস

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন এই দলীয়কৃত প্রশাসনের আসল ও ভয়ংকর রূপটি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ড. ইউনূস সরকারের সময় প্রশাসনযন্ত্রে যে নজিরবিহীন অসহযোগিতা দেখা গেছে, তা ছিল সুপরিকল্পিত অন্তর্ঘাত।

সচিবালয় ঘেরাও ও কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা: সরকার গঠনের মাত্র কয়েকদিনের মাথাতেই আনসার বিদ্রোহ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সরকারি কর্মচারীদের রাতারাতি দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে সচিবালয় ঘেরাও করে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়, তা কোনো সাধারণ আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল মূলত প্রশাসনের স্নায়ুকেন্দ্রকে অচল করে দেয়ার কৌশল।

গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র ধ্বংস: ক্ষমতা হস্তান্তরের ডামাডোলের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও মেগা প্রকল্পে অগ্নিকাণ্ড এবং পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার, মেগা প্রজেক্টের টেন্ডার বাণিজ্য এবং গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রামাণ্য দলিল গায়েব করার জন্যই এই কাজ করা হয়। নথিপত্র ধ্বংসের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যৎ আইনি ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করা এবং শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগকে প্রমাণশূন্য করে দেয়া।

মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয়তা: পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ কর্মবিরতির নামে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকে। ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এই অস্থিরতা তৈরি করে তারা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা জন্ম দেয়ার চেষ্টা করেছিল যে, ক্ষমতাচ্যুত দল ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়।

তারেক রহমান সরকারের সামনে বহুমুখী কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ: ড. ইউনূস সরকারের সময় যে অন্তর্ঘাতমূলক নকশা ব্যবহৃত হয়েছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক সরকারের ক্ষেত্রেও একই বা আরও তীব্র কাঠামোগত অন্তর্ঘাতের ঝুঁকি বিরাজমান। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, এই ১৫ বছর ধরে গড়ে ওঠা একমুখী প্রশাসনযন্ত্রকে রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। নতুন সরকারের সামনে মূলত

পাঁচটি সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

ক. নীতিগত প্যারালাইসিস বা ‘গো-স্লো’ কৌশল: সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরাসরি কোনো বিদ্রোহ না করলেও, তারা ‘নিয়ম রক্ষার’ দোহাই দিয়ে ফাইল আটকে রাখবেন। বৈদেশিক বিনিয়োগ, মেগা প্রকল্পের সংশোধন বা জনকল্যাণমূলক জরুরি সিদ্ধান্তগুলো মাসের পর মাস আটকে রেখে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম জটিলতা তৈরি করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দেয়ার ঝুঁকি থাকবে প্রবল।

খ. কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের কারসাজি: ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই বাজার সিন্ডিকেট, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আর্থিক খাতে হঠাৎ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হতে পারে। মাঠপর্যায়ের আমলারা যদি বাজার মনিটরিংয়ে নিষ্ক্রিয় থাকেন, তবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। বিগত সরকারের সঙ্গে আঁতাতকারী অলিগার্করা এই সিন্ডিকেটগুলোকে অর্থায়ন করে সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করবে।

গ. তথ্য পাচার ও প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজ (Digital Sabotage): প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অংশটি সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্ত বা অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর তথ্য বিরোধী শিবিরের কাছে পাচার করতে পারে। এ ছাড়া ই-নথি (ঊ-ঘড়ঃযর) সিস্টেমে থাকা ডেটাবেস হ্যাক করা বা পূর্ববর্তী অনিয়মের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলার মতো প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজের ঝুঁকি এই সরকারের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হবে।

ঘ. আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচার: আমলাতন্ত্রের একাংশ, যারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেন, তারা নতুন সরকার সম্পর্কে ভুল ও নেতিবাচক তথ্য পাচার করে বৈদেশিক ঋণ, অনুদান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন।

৬. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা: পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতরে থাকা পূর্ববর্তী সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল অংশটি ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধীদের ছাড় দেয়া, রাজনৈতিক ইন্ধনে দাঙ্গা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনাগুলো ঘটাতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে।

সংকট উত্তরণের কৌশল: প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এই ধরনের বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত অন্তর্ঘাত মোকাবিলায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে গতানুগতিক রাজনৈতিক বদলার (Witch-hunt) বাইরে এসে সুনির্দিষ্ট, আধুনিক ও যুগান্তকারী প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। ঢালাও রদবদল বা শুদ্ধি অভিযান চালালে প্রশাসনে চরম ভীতি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, যা পুরো চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেবে।

১. প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও ই-গভর্ন্যান্স (E-Governance): নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলা বা গায়েব করার মতো ঘটনা ঠেকাতে কাগজের ফাইলের উপর নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি বা সুরক্ষিত ক্লাউড সিস্টেমে সরকারি নথির রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা যদি একটি ফাইল নির্দিষ্ট সময়ের বেশি আটকে রাখেন, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেন্ট্রাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে রেড অ্যালার্ট (Red Alert) হিসেবে প্রদর্শিত হবে।

২. মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন পুনর্গঠন (Meritocracy): পূর্ববর্তী সরকারের অনুগতদের সরিয়ে কেবল নিজেদের দলীয় লোক বসানোর চিরচেনা নীতি গ্রহণ করলে প্রশাসনের বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে এবং দুর্নীতি নতুন রূপ নেবে। এর বদলে, একটি স্বাধীন ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’-এর মাধ্যমে মেধাভিত্তিক পদায়ন করতে হবে। যারা বিগত দিনে কেবল রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন কিন্তু অত্যন্ত পেশাদার ও দক্ষ, তাদের যোগ্য স্থানে বসিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।

৩. কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স: বাজার, ব্যাংক এবং জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে জনসেবা বিঘ্নিত করবে বা সিন্ডিকেটকে সহায়তা করবে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা (ঝঢ়বপরধষ ঞৎরনঁহধষ) নিশ্চিত করতে হবে।

৪. স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার (উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) ব্যবস্থাকে আরও বেশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি তদারকিতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে আসবে।
৫. স্বচ্ছতা ও জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ (Public Communication): সরকারের ভেতরে যদি কোনো স্যাবোটাজ হয় বা কোনো সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তবে তা লুকানোর বদলে তথ্য-প্রমাণসহ সরাসরি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। জনগণ প্রকৃত সত্য জানলে তারা সরকারের পাশে দাঁড়াবে এবং অন্তর্ঘাতকারীদের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠবে।

সরকারের ভেতর থেকে সরকারবিরোধী শক্তির অন্তর্ঘাত তৃতীয় বিশ্বের মেরুকৃত দেশগুলোতে একটি নির্মম বাস্তবতা। অতীতের ২০০১ সালের ভুল এবং ২০২৪ সালের ড. ইউনূস সরকারের আমলের অন্তর্ঘাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আমলাতন্ত্র গড়ে তোলাই তারেক রহমান সরকারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। রাষ্ট্র সংস্কারের এই কঠিন যাত্রায় ব্যর্থ হলে, জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও ভেতরের অদৃশ্য শত্রুদের কারণে নতুন সরকারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বারবার হোঁচট খাবে এবং রাষ্ট্র এক অন্তহীন অস্থিতিশীলতার চক্রে প্রবেশ করবে।