দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও তদন্তেও গতি এসেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে সংস্থাটি। একই সময়ে দুর্নীতির মামলায় জরিমানা আদায় ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের পরিমাণও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। কিন্তু মামলার এ পরিমাণগত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি সাজা পাওয়ার হার। বরং ২০২৩ সালে প্রায় ৬৯ শতাংশে ওঠার পর পরের দুই বছরে তা ৫০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। দুদক থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর দুদকের মামলায় প্রায় ৫ হাজার ৬০ কোটি টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে। আগের বছর আদায় হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। একই সময়ে বাজেয়াপ্ত করা সম্পদের মূল্যও বেড়ে প্রায় ৩২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, বিগত দিনে সাজা কম কেন হয়েছে তা আমি বলতে পারব না। তবে আমি আশা করি আগামীতে ভালো ফলাফল দুদকের জন্য আসবে। দুদক সূত্র বলছে, গত বছর দুদক ৬৭৪টি মামলা করেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৫১। অর্থাৎ এক বছরে মামলা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এর আগে ২০২১ সালে ৩৪৭টি, ২০২২ সালে ৪০৬টি এবং ২০২৩ সালে ৪০৮টি মামলা হয়েছিল। ফলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে দুদক। মামলার পাশাপাশি অনুসন্ধান কার্যক্রমেও বেড়েছে কাজের পরিমাণ। গত বছর আগের বছরের অনিষ্পন্ন ৩ হাজার ১৮৫টি এবং নতুন করে নেওয়া ২ হাজার ৪৮১টি মিলিয়ে মোট অনুসন্ধান ছিল ৫ হাজার ৬৬৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০৯টি অনুসন্ধান শেষ হয়েছে। অনুসন্ধান শেষে ৬৭৪টি মামলা এবং ৩৩৭টি অনুসন্ধান পরিসমাপ্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
গত বছর দুদকে মোট অভিযোগ জমা পড়ে ১০ হাজার ৮৭৯টি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮৪২। অর্থাৎ অভিযোগের সংখ্যা কমেছে। তবে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৮৯৪টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হলেও গত বছর নেওয়া হয় ২ হাজার ৫৩৬টি।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরের হিসাবেও অভিযোগের সংখ্যা ওঠানামা করেছে। ২০২১ সালে প্রায় ১৪ হাজার ৭৮৯টি, ২০২২ সালে ১৯ হাজার ৫৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এরপর ধারাবাহিকভাবে তা কমেছে।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের সবচেয়ে বড় উৎস সাধারণ মানুষ। এরপর সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং দুদকের ১০৬ নম্বর হটলাইন থেকে তথ্য আসে। দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট গত বছর ৬৫৩টি নথি খুলে ৩৫৭টির কার্যক্রম শেষ করেছে।
দুদকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মামলা দায়ের বাড়লেও আদালতে সাজা পাওয়ার হারে ধারাবাহিক উন্নতি হয়নি। ২০২১ সালে দুদকের মামলায় সাজার হার ছিল ৩০ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৬৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৬৯ দশমিক ১০ শতাংশে ওঠে। সেটিই সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হার।
এরপর ২০২৪ সালে সাজার হার নেমে আসে ৪৮ দশমিক ১৯ শতাংশে। গত বছর কিছুটা বেড়ে তা ৫২ শতাংশ হয়। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় সাজার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
গত বছর মোট ২৬৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ১৩৪টিতে আসামিদের সাজা হয়েছে, ১১৮টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
জানা যায়, পুরোনো দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলে করা মামলাগুলোর পরিস্থিতি আরও দুর্বল। ২০২৪ সালে এসব মামলায় সাজার হার ছিল ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত বছর তা নেমে হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। তবে মানিলন্ডারিংয়ের মামলার চিত্র তুলনামূলক ভালো। গত বছর এসব মামলায় সাজার হার ছিল প্রায় ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তির হার ছিল ৫৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। মামলার সাজা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অর্থদণ্ড ও সম্পদ রাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রে গত বছর বড় অগ্রগতি দেখা গেছে। পাঁচ বছরের মধ্যে গত বছরই সবচেয়ে বেশি জরিমানা আদায় হয়েছে।
২০২১ সালে প্রায় ৭৫ কোটি, ২০২২ সালে ২ হাজার ৬৩২ কোটি, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬৮৪ কোটি এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা জরিমানা আদায় হয়েছিল। গত বছর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৬০ কোটি টাকা।
একই সময়ে বাজেয়াপ্ত সম্পদের মূল্যও বেড়েছে। ২০২১ সালে প্রায় ১০ কোটি, ২০২২ সালে ১৪ কোটি, ২০২৩ সালে ১৮ কোটি এবং ২০২৪ সালে ১২ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। গত বছর এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বাজেয়াপ্ত সম্পদের মূল্য প্রায় ২৭ গুণ বেড়েছে।
দুদকের তথ্যানুযায়ী, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও দুদকের কার্যক্রম বেড়েছে। দেশের ভিতরে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও যানবাহনসহ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা সম্পদের মূল্য ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
মামলা দায়েরের পর গত বছর মোট ২ হাজার ৭০২টি মামলা তদন্তাধীন ছিল। এর মধ্যে আগের বছরের অনিষ্পন্ন তদন্ত ১ হাজার ৬৮২টি এবং নতুন তদন্ত ১ হাজার ২০টি। বছরটিতে ৫২৩টি তদন্ত শেষ হয়েছে।
তদন্ত শেষে ৩৮৬টি মামলায় চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়। আরও ১১৩টি মামলায় অব্যাহতিমূলক চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২৪টি তদন্ত আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে অন্য সংস্থায় পাঠানো হয়।
দুদক সূত্র জানায়, গত বছর বিচারিক বা নিম্ন আদালতে ৪০৪টি, হাই কোর্ট বিভাগে ১৪৬টি এবং আপিল বিভাগে ৪৮১টি মামলা স্থগিত হয়। তিন স্তর মিলিয়ে স্থগিত মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজারের বেশি।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট গত বছর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের অভিযোগ শনাক্ত করেছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল ও সম্পত্তি নিবন্ধনে ঘুষ দাবি ও হয়রানি নিয়ে, অর্থাৎ এ সংখ্যা ৫০টি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা এবং সরকারি ওষুধ পাচার এবং বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার অনিয়ম নিয়ে ৪১টি করে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৩৯টি এবং এলজিইডিসহ প্রকৌশল দপ্তরে রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়ম নিয়ে ৩১টি অভিযোগে অভিযান চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া পাসপোর্ট, ভূমি, কৃষি, রেলওয়ে, গণপূর্ত, নির্বাচন অফিস ও রাজউকেও অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে দুদক।