চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের কথা থাকলেও প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এর ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পের ব্যয় আরও ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাড়ানোর তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং এর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকার কিছু বেশি। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ১৯৬৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আর এবার তৃতীয় সংশোধনীতে এ ব্যয় বেড়ে ২২ হাজার ২১৩ কোটি ১০ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, দ্বিতীয় সংশোধনীর তুলনায় তৃতীয় সংশোধনীতে নতুন করে ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বোঝা যুক্ত হলো। নতুন এ সংশোধিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা জিওবি থেকে ৫ হাজার ১১৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক প্রকল্প ঋণ হিসেবে ১৭ হাজার ৯৭ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। নথি বলছে, মন্ত্রণালয় গঠিত অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ডিফেক্ট নোটিফিকেশন পিরিয়ড পরবর্তী সময়-অর্থাৎ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ সময় পর্যন্ত ৩০ মাসের মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৬৬৭ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা (ট্যাক্স ও ভ্যাট ব্যতীত) ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ঠিকাদারি চুক্তির ভেরিয়েশনজনিত ডিসপুট বা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সেটেলমেন্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় আরও ২৯৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা (ট্যাক্স/ভ্যাট ব্যতীত) বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিআইপি/ভিভিআইপি ফ্যাসিলিটিস, কার্গো হ্যান্ডলিং সিস্টেমের পারফরম্যান্স টেস্টিং, থার্ড টার্মিনালের ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেমের টেস্টিং, ওয়াটার ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের টেস্টিং এবং এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের ইউপিএস সরবরাহসহ অন্যান্য ইকুইপমেন্ট সুপারভিশনের জন্য ১৬ জন বিদেশি ও ২ লিয়াজোঁ বা স্থানীয়সহ মোট ২২৮ জন পরামর্শকের ১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের সিডি/ট্যাক্স/ভ্যাটসহ জিওবি খাতে ব্যয় ১৩৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা কমানো হয়েছে।
গতকাল একনেক সভা পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, আগামী জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত ৩০ মাসের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৬৬৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা (ট্যাক্স ও ভ্যাট ব্যতীত) ব্যয় ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু না হলেও যারা এটি নির্মাণ করেছেন এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন, তাদের এই ৩০ মাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া ঠিকাদারি চুক্তির ভেরিয়েশনজনিত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সেটেলমেন্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আরও ২৯৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শাকিল আখতার এ সংশোধনী ও আংশিক উদ্বোধনের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, থার্ড টার্মিনালের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত না করা হলে টার্মিনালটি পুরোপুরি অপারেশনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একইভাবে, ইমিগ্রেশন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেবল পর্যাপ্ত জনবল থাকলেই চলবে না, এর জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ইমিগ্রেশন যন্ত্রপাতিও পুরোপুরি স্থাপন ও প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি জানান, প্রকল্পের মূল বরাদ্দের মধ্যেই ইমিগ্রেশন সরঞ্জাম এবং পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে যেকোনো বড় প্রকল্পে বিস্তারিত সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরও কিছু আনুষঙ্গিক বা জরুরি কাজ মাঝেমধ্যে বাদ পড়ে যেতে পারে। এই মেগা প্রকল্পেও তেমনি কিছু প্রয়োজনীয় কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে।
একনেক সূত্র জানায়, আগামী ১৬ ডিসেম্বর প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হলেও কিছু অসমাপ্ত কাজ শেষ না করে এটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক চালনা বা অপারেশনে নেওয়া সম্ভব নয়।
তাই যাবতীয় অসমাপ্ত কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শতভাগ নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে শেষবারের মতো জুন ২০২৭ পর্যন্ত নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সব ধরনের টেস্টিং ও টেকনিক্যাল কাজ সফলভাবে শেষ হবে।