Image description

কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়েছে। এইসঙ্গে দাম বেড়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সামগ্রীরও। ফলে সাধারণ পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ দিনে দিনে অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছেছে।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রত্না আকতার দুই সন্তানের অভিভাবক। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ আগের থেকে অনেকটাই বেড়েছে। স্কুলের বেতন, স্কুল ব্যাগ, পোশাকসহ অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর বাড়তি খরচ মিলিয়ে সংসারের সার্বিক খরচ অনেক বাড়িয়েছে। খরচ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসই বাজারের তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে। সীমিত আয়ে সবকিছু সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ মাসিক বাজেটে সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে রত্না আকতারের মতো মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সবাইকেই। যদিও বর্তমানে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষা উপকরণ ব্যাগ, জামা, জুতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যেগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগীরা। তবে তা অপ্রতুলতার কারণে সব স্তরে মিলছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সরকারি সহায়তা ঢালাওভাবে না দিয়ে ‘টার্গেটেড ইন্টারভেনশন’ বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া উচিত, যাতে প্রকৃত প্রান্তিক ও দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা শিক্ষার্থীরাই এই সুবিধা পায়। বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা করছেন, দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অনেক অসচ্ছল শিক্ষার্থীর পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যাবে।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনারি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী খাতা কলম, পেনসিল, শার্পনার, ইরেজার, ক্যালকুলেটর, জিওমেট্রি বক্সসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম গত পাঁচ বছরে আকাশছোঁয়া। কিছু পণ্যের দাম না বাড়লেও কমেছে আকার ও মান। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জিওমেট্রি বক্স ১২০-৩০০ টাকা, ক্যালকুলেটর মান ও মডেল অনুযায়ী ২০০-২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যা পাঁচ বছর আগে তুলনামূলক আরও কম দামে পাওয়া যেত। এ ছাড়া অল্প বয়সি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত শার্পনার, ইরেজার, কাঠপেন্সিল, রংপেন্সিলের দামও বেড়েছে। স্টেশনারি বাজারের সব পণ্যের দাম সরাসরি বাড়েনি। কিছু পণ্যের দাম আগের মতোই ৫ বা ১০ টাকা রাখা হলেও আকার ও পরিমাণে কমানো হয়েছে।

১০ টাকা দামের রাবার এখনো পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আগের তুলনায় আকার অনেক ছোট হয়েছে। ক্রেতা একই পরিমাণ টাকা খরচ করলেও হাতে পাচ্ছেন তুলনামূলক কম পণ্য। যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় সংকোচন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির প্রভাব বেশি দেখা যায় শিক্ষার্থীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ খাতায়। ২৮০ টাকার রিম খাতার দাম গত পাঁচ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫০ থেকে ৬২০ টাকায়। খুচরায় দিস্তা হিসেবে কাগজ কেনেন অনেক ক্রেতা। ২৪ পৃষ্ঠার এক দিস্তা কাগজ পাওয়া যেত ১৫ টাকায়, সেই এক দিস্তা কাগজ কেনার জন্য গুনতে হচ্ছে ৩৫ টাকা। ৩০০ পৃষ্ঠার স্পাইরাল খাতা ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে কিনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল খাতার দামও বেড়েছে। ৫০ টাকার খাতা এখন কিনতে হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়। তবে এই দাম পৃষ্ঠা অনুযায়ী কম বেশি হতে পারে।

রাজধানীর বাড্ডার সুমনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. রফিক মিয়া ১০ বছর ধরে স্টেশনারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, করোনার পর থেকেই স্টেশনারি ও শিক্ষাসামগ্রীর দাম বাড়তে থাকে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে যাতায়াত খরচও অনেক বেড়েছে, যার কারণে জিনিসপত্রের দামও পরিবর্তন এসেছে। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ‘দেশে শিক্ষাসামগ্রীর মূল্যের ওপর কোনো কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিং নেই’ উল্লেখ করে বলেন, কেবল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বললেই এই সংকটের সমাধান হবে না।

 শিক্ষাসামগ্রীর বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও জোরদার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায়, শিক্ষা খরচের ভারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের ঝরে পড়ার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সার্বিক অর্থনীতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজার ও টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও, সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট দেশের ভিতরের বাজারকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে শিক্ষা খাতের ওপর মূল্যস্ফীতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।