রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৪১) গত বুধবার জ্বর অনুভব করেন। দুই দিন পর টেস্টে ডেঙ্গু পজিটিভ এবং অন্যান্য রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন।
এ প্রতিবেদককে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গেলে জানতে পারি শয্যা খালি নেই। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানেও শয্যা ফাঁকা নেই, মেঝেতে অসংখ্য রোগী।
এ অবস্থায় মালিবাগ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে গেলে সেখানেও শয্যা না পেয়ে নিজের সামর্থ্যরে বাইরে বনশ্রী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হই। শরীরে জ্বর নিয়ে এত হাসপাতাল ঘুরে আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।’
ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় অনেক হাসপাতালে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা। আবার কোথাও শয্যা না পেয়ে রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর চাপ। হাসপাতালে শয্যার জন্য রোগীদের হাহাকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৯৪২ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ছয়জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৬৭২ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৩৯ জনের।
একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭৫১ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। অর্থাৎ নতুন করে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর চেয়ে বেশি। ফলে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতালভিত্তিক হিসাবে, গতকাল ঢাকার সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮৭ জন নতুন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন। এসব হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ৬২ জন রোগী চিকিৎসাধীন। একই সময়ে এসব হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। রাজধানীর কিছু হাসপাতালে চাপ বেশি, কোথাও কম। তবে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যালাইন, কিট, ওষুধের সংকট নেই। হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট তো আগে থেকেই রয়েছে। সংকট নিরসনে চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাত হাজার নার্স নিয়োগের পরীক্ষা চলমান রয়েছে। এ নিয়োগগুলো সম্পন্ন হলে সেবার মান আরও বাড়বে।’
সরেজমিনে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দা, করিডর সব জায়গায় ডেঙ্গুরোগী। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ড, নারী ও পুরুষের পৃথক ওয়ার্ড ছাপিয়ে মেঝেতেও আর জায়গা হচ্ছে না। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকেও ডেঙ্গুরোগী নিয়ে আসছেন স্বজনরা। সঙ্গে অন্য রোগের রোগীও ভর্তি হচ্ছে। রোগী সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসকদের। এর মধ্যে নার্স, ওয়ার্ড বয়সহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট প্রকট।
হাসপাতালের মেঝেতে ছেলে ওয়াসিমকে (২২) নিয়ে আছেন শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা বেগম। তিনি বলেন, আমার ছেলে কল্যাণপুর এলাকার গ্যারেজে কাজ করে। চার দিন আগে জ্বর আসে। এরপর বমি এবং দাঁত দিয়ে রক্ত আসলে হাসপাতালে নিয়ে আসি।’
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে শয্যা ১৯০, রোগী ভর্তি আছেন ২২৮ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর অনেক চাপ। ডাক্তার দিয়ে চালিয়ে নিলেও নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট প্রকট। এ ব্যাপারে নার্সিং অধিদপ্তরের চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। ওষুধ, কিটের সংকট নেই।’ রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও রোগীর চাপ কম নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব প্রতিষ্ঠানে ১২০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৭২ জন। এ সময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও সেপ্টেম্বরের ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি ধরা পড়েছে। আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১ হাজার ৮২৬ জন। সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ দিনে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫৩৬ জন। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে; আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৪২ জনের।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক-নার্সসহ চিকিৎসাসেবার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত এবং ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার প্রয়োজন।’
হাসপাতালগুলোর তথ্য বলছে, রোগীর চাপ এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, যশোর, বরিশাল, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিভাগ মিলিয়ে ৫৯ হাজার ৯৪৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং ৫৬ হাজার ৬১১ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন; বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪ হাজার ১৯১ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, সারা দেশে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫ হাজার ৪২৫ জন ডেঙ্গুরোগী।