Image description

সারা দেশে বাড়ছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের রোগী। প্রায় ঘরেই আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। অনেক পরিবারে একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন একাধিক সদস্যও। এর মধ্যে কেউ কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সারা দেশে হাসপাতালগুলোতে শয্যার চেয়ে ডেঙ্গু রোগী বেশি আসায় ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ডেঙ্গুতে চলতি বছরে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৯ জনে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার রোগী। এরমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই প্রাণ গেছে ১৪২ জনের। দেশে অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার উপর জোর দিয়েছেন তারা।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ২৩৯ জনে দাঁড়ালো। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৯৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৭৭ হাজার ৬৭২ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একজন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন ও রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) তিনজনের প্রাণহানি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) সবচেয়ে বেশি ৩৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

পাশাপাশি এই সময়ে খুলনা বিভাগে ২৬৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৯ জন, বরিশাল বিভাগে ২১৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১২০ জন, রংপুর বিভাগে ৫৬ ও সিলেট বিভাগে ৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১লা জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ১১৩ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লিখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৪৫ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ২০, বরিশাল বিভাগে ১৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩, রাজশাহী বিভাগে ১৪, রংপুরে ৫ জন ও সিলেট বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে প্রাণ গেছে ১৪২ জনের। আগস্টে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৪৩ জন, জুলাইতে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন. মে’তে একজন, ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতে দুইজন করে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, মৌসুমি জ্বর-সর্দির পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বরের শুরুর দিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গের মধ্যে মিল থাকায় অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কেউ কেউ সাধারণ জ্বর ভেবে পরীক্ষা না করিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। এতে পরে ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে জ্বর, সর্দি-কাশির রোগীর চাপ বেড়েছে। শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগামী অক্টোবরে আরও খারাপ হতে পারে বলে একটি পূর্বাভাসভিত্তিক মডেলের তথ্য জানিয়েছেন ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, আমাদের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল বলছে, অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তিনি বলেন, সাধারণভাবে মনে করা হয় এডিস মশা শুধু দিনের বেলায় কামড়ায়-এ ধারণাটি সঠিক নয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এডিস মশা রাতেও কামড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, শীতকালে এডিস মশা কম দেখা গেলেও মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মানুষকে কামড়ানোর পর এডিস মশার ভাইরাসটি অন্য মানুষের মধ্যে ছড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হতে কমপক্ষে দুইদিন সময় লাগে। এ কারণে পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কয়েকদিন পর অন্য সদস্যদের মধ্যেও ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের কোনো সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ঘরের ভেতর থেকে মশা দূর করার ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর মাধ্যমে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ডাবের খোসা, ফুলের টব বা পলিথিনে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। রাতে মশারি ব্যবহার এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে অপচিকিৎসার আশ্রয় না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।