ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি আর তীব্র জনবলসংকট নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে যশোর শিশু (বালক) উন্নয়নকেন্দ্র। কেন্দ্রটিতে লঘু ও গুরুতর অপরাধীরা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধপ্রবণ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর লক্ষ্য কতটা সফল হচ্ছে তা নিয়ে শঙ্কা আছে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলে।
অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও সংশোধনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে ১৯৯২ সালে যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাটে প্রতিষ্ঠিত হয় এ কেন্দ্রটি। কিন্তু সারা বছরই অতিরিক্ত বন্দির চাপ আর তীব্র জনবলসংকট সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলেছে। সর্বশেষ অনুযায়ী, কেন্দ্রটিতে ১৫০ বন্দি ধারণক্ষমতার বিপরীতে আছে ৩৬৬ জন, যাদের অনেকেই হত্যা মামলায় অভিযুক্ত।
একেকটি রুমে চারজনের বিপরীতে সাত থেকে আটজন করে রাখতে হচ্ছে। চুরির মতো ছোটখাটো অপরাধে জড়িত শিশুরা গুরুতর অপরাধে জড়িতদের সংস্পর্শে চলে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চুরির মামলায় কেন্দ্রটিতে বন্দি থাকা ভাগনেকে দেখতে এসেছিলেন মফিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। খুনসহ বড় অপরাধের মামলায় আটক শিশুদের সঙ্গে তার ভাগনেকে রাখায় দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। সে কারণে প্রায়ই ভাগনেকে দেখতে আসেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম জাকারিয়া বলেন, এত কম জনবল দিয়ে এতগুলো শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন।
যে কারণে প্রায়ই কেন্দ্রটিতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রটিতে চারটি খুন, একটি আত্মহত্যা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট আকাশ (১২) নামে এক শিশু বন্দিকে শ্বাসরোধ করে ও টিনের টুকরো দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালের ৫ মে কেন্দ্রটিতে দায়িত্বরত পুলিশের সঙ্গে শিশু বন্দিদের সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্যসহ ১৫ জন আহত হন। এরপর ২০১৯ সালের ৩০ জুন নূর ইসলাম (১৫) নামে একটি শিশু কেন্দ্রটিতে আত্মহত্যা করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে বন্দি তিন শিশুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
যশোরের তরুণ আইনজীবী তাহমিদ আকাশ বলেন, অপরাধের ধরন, বয়স ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় শিশু অপরাধীদের পৃথক ব্যবস্থাপনা জরুরি। গুরুতর অপরাধে জড়িত শিশুদের প্রভাব থেকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধে জড়িতদের দূরে রাখা, পর্যাপ্ত তদারকি ও নিয়মিত কাউন্সেলিং করা না গেলে সংশোধনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে কেন্দ্রটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫২টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। নিরাপত্তারক্ষীর ১৫টি পদের সবগুলোই শূন্য। সহকারী তত্ত্বাবধায়ক, প্রবেশন অফিসার, হাউস প্যারেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদসহ ৪০টি পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুরুল হাছান অতিরিক্ত বন্দির কথা স্বীকার করে বলেন, চারজনের রুমে সাতজনকে রাখতে হচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধীদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করা হয়। আর জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, বিকল্প ব্যবস্থায় ৩৩ জন আনসার সদস্যকে দিয়ে নিরাপত্তার কাজ চালানো হচ্ছে। এর বাইরে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ২৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের চুক্তির মেয়াদও আগামী বছর শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে বন্দি তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর তিনি এ কেন্দ্রে নিয়োগ পান। এরপর তিনি কেন্দ্রটিকে শৃঙ্খলা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আর কোনো অঘটন ঘটেনি বলে দাবি করেন।