প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পুরোপুরি সক্রিয় নয় বলে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মহল থেকে অভিযোগ আছে। পাশাপাশি পুলিশ ও প্রশাসনে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্যের কথা বলা হচ্ছে সরকারের ভিতর থেকেই। এরকম পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও পুলিশকে গতিশীল করা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই। সরকারের কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার গঠনের সাত মাস পর সরকার মূল জায়গায় হাত দিতে পেরেছে। তাদের এ অবস্থানের ধারাবাহিকতা রাখতে হবে।
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, সরকার সঠিক পথেই আছে। তবে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটাতে চাইবে, বিভিন্নভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইবে। এজন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা দলমতনির্বিশেষে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও দায়িত্বে অবহেলা, ফ্যাসিবাদীদের তথ্য সরবরাহ ও অন্য যেকোনো অপরাধ বরদাশত করা হবে না।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, প্রশাসনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থেকে যারা সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে কিংবা সাবেক ফ্যাসিবাদী শক্তিকে গোপনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের যেসব সদস্য ফ্যাসিবাদী শক্তির কাছে তথ্য পাচার করছে- তাদের তালিকা করছে পুলিশ সদর দপ্তর। এরই মধ্যে ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ও বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে বাড়ানো হয়েছে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি। শুধু তাই নয়, ঘুষ, দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, জুয়া, মাদক সেবন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলেই নেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
ঘটনা ঘটলেই পরিদর্শনে ছুটে যাচ্ছেন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগতে অপপ্রচার ঠেকাতে বিশেষ আইন প্রয়োগ এবং পুলিশের নতুন সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে সরকার। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যা যা করণীয়, সব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির জন্য মাঠপর্যায়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোথাও দায়িত্ব অবহেলায় আইনশৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, মোহাম্মদপুরে নির্মাণাধীন ভবন দখল, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের অফিসে হামলা, গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক ওসির অডিও ফাঁসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নাশকতার চেষ্টা, পুলিশের কারও কারও বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ এবং অপরাধীদের মাথা চাড়া দেওয়ার চেষ্টা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নতুন শঙ্কা যোগ করেছে। এ অবস্থায় অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
সচিবালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যারা সরকারকে সহযোগিতা করছে না বা কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে, বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে, তাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যারা চাকরির শৃঙ্খলা বা বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার প্রশাসনকে ধ্বংস করে গেছে। বর্তমান সরকার অকার্যকর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রশাসনব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তুলছে।
সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অনেক মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি কমে গেছে। ফাইলের স্তূপ পড়ে আছে। এর কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পত্র এবং নথি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব কমাতে আকস্মিক পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সবাই দোষী নয়, যারা দোষী বা দলবাজ ছিল তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা পাওয়ায় শাহআলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০ জন। অবশ্য শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তখনই ইঙ্গিত পাওয়া যায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সত্যিকার অর্থেই হার্ডলাইনে সরকার।
এর আগে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি মো. রাকিবুল হাসানের বিতর্কিত অডিও ভাইরাল হলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাকিবের এ বক্তব্যের পরপরই সরকারের শীর্ষ মহলের টনক নড়ে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা পুলিশের গুপ্ত সদস্যদের তৎপরতা খতিয়ে দেখা শুরু হয়। ওই ওসির ব্যবহৃত ডিভাইস বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে ডিসি তানভীর আহমেদ, এডিসি মো. সরোয়ার হোসেন ও ওসি মো. দাউদ হোসেনকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হয়।
এ ছাড়া ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশ অধিদপ্তরের পুলিশ সুপার (এসপি) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনকে বরখাস্ত করা হয়। চলন্ত ট্রেনে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত ২ সেপ্টেম্বর রেলওয়ে পুলিশের চার সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। একই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি এবং ঘুষ নিয়ে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অভিযোগে পুলিশের সাত কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্ত করা হয়।