চট্টগ্রাম-কক্সবাজারভিত্তিক মাদক সাম্রাজ্যে খোলস পরিবর্তিত হয়েছে। জানা গেছে, সীমান্ত থেকে উপকূল পর্যন্ত রাতারাতি উত্থান ঘটেছে শতাধিক নতুন ডনের। ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ স্টাইলে এলাকা ভাগ করে তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিশাল বাজার। একই সঙ্গে পুরোনো শীর্ষ গডফাদাররা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ‘রেশনাল চয়েজ’ পদ্ধতি অবলম্বন করছে। অর্থাৎ গডফাদাররা সরাসরি মাঠে না থেকে কয়েক স্তর পেছনে থেকে সুতা নাড়ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি পার্টনারশিপ, লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডি, গভীর সমুদ্রে ‘ভাসমান গুদাম’ এবং ডেলিভারিতে ‘ডেড ড্রপ’ পদ্ধতির মতো অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে সিন্ডিকেটগুলো। এইসঙ্গে বদলে ফেলা হয়েছে পাচারের চিরাচরিত রুটও। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মাদকের এ নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর ও ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে ধারণা পওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন এই শতাধিক ডন ছোট ছোট ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ বা সেলে বিভক্ত হয়ে মাদক কারবার পরিচালনা করছে। এইসঙ্গে পরিবর্তন আনা হয়েছে মাদক পাচারের পদ্ধতিতেও। আগে মিয়ানমারভিত্তিক বিদ্রোহী সংগঠনগুলো মাদক চালানের পাহারাদার কিংবা ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করত। এখন পাচারের অংশীদার হয়ে তারা প্রতিটি চালান থেকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন নিচ্ছে। স্থানীয় নতুন মাফিয়াদের সঙ্গে সরাসরি পার্টনারশিপ গড়ে তুলে এরা নিজেরাই ডিলার বা মূল সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রথাগত মাদক কারবারিদের বাইরেও ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক, অসাধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং উঠতি কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকরা হয়ে উঠেছে মাদক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণকারী। মাদকের টাকা লেনদেনেও আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন। নগদ টাকার লেনদেন বা দেশীয় ব্যাংক চ্যানেল ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এর বদলে মিয়ানমারের ডিলার বা মূল হোতাদের পেমেন্ট করা হচ্ছে দুবাই, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরভিত্তিক হুন্ডি নেটওয়ার্কে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সি।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে টেকনাফ বা শহরের কোনো নির্দিষ্ট গুদামে ইয়াবা বা আইস মজুত না করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বড় ট্রলারগুলোকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডিলারদের অর্ডার মতো স্পিডবোটে করে গভীর সমুদ্র থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে মাদকের চালান। সাব-ডিলার এবং বাহকদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের বদলে টেলিগ্রাম, থ্রিমা ও সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদক ডেলিভারির ক্ষেত্রে সরাসরি হাতবদল না করে ‘ডেড ড্রপ’ (প্যাকেট নির্দিষ্ট কোনো ঝোপ, ডাস্টবিন বা পার্ক করা গাড়ির নিচে রেখে আসা এবং পরে ক্রেতা তা তুলে নেওয়া) পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও জানা গেছে, চোরাকারবারিরা এখন সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ দিক দিয়ে গভীর বঙ্গোপসাগর রুট ব্যবহার করছে।
মিয়ানমার থেকে সরাসরি ট্রলারে করে চালান মাঝ সমুদ্রে চলে আসছে। আগে মাদকের মূল প্রবেশদ্বার ছিল টেকনাফ ও উখিয়া। রুট পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা ও পতেঙ্গা উপকূল ল্যান্ডিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সমুদ্রপথের পাশাপাশি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম এবং থানচি সীমান্ত দিয়েও নতুন রুট তৈরি করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে পাহাড়িদের প্রক্সি হিসেবে কাজে লাগিয়ে ইয়াবা ও আইসের চালানগুলো সরাসরি চট্টগ্রাম বা দেশের অন্যান্য স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মাদক সাম্রাজ্যে আমূল বদল এসেছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো প্রভাবশালী কারবারিদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তৈরি হওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে এ অঞ্চলে রাতারাতি উত্থান ঘটেছে শতাধিক নতুন মাদক গডফাদারের। পুরোনো সিন্ডিকেটের খোলস বদলে সীমান্ত ও উপকূলীয় পয়েন্টগুলোতে এখন একক আধিপত্য বিস্তার করছে এই নতুন ডনরা। এখন টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী রুটে সক্রিয় শতাধিক নতুন কারবারি।
এদের বড় অংশই আগে ছিল মূল গডফাদারদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, মাঝারি স্তরের লাইনম্যান, ট্রলার মালিক কিংবা সীমান্ত চোরাকারবারি। স্থানীয় প্রভাববলয় পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা সরাসরি মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ফলে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের (আইস) চালান খালাসে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন সিন্ডিকেট। এসব বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপপরিচালক মানজারুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুই বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নতুন অনেকে মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।’
কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘কক্সবাজারের মাদক কারবারিদের একটি সমন্বিত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ওই তালিকায় চার শতাধিক নাম উঠে এসেছে। তালিকায় থাকা মাদক কারবারিদের মধ্যে রয়েছে দিনমজুর, রিকশা চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।’ চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘মাদক কারবারে একটি গ্রুপ আড়ালে চলে গেলে, আরেকটা গ্রুপ সক্রিয় হয়- এটা অনেকটা সাধারণ বিষয়। এটা মাথায় রেখেই পুলিশ কাজ করে। তাই মাদক কারবারিদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। নতুন তালিকা ধরেই মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।’
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক জাহিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘গত দুই বছরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন অনেক মুখ। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার বড় ডিলার। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের এ সংখ্যা অনেক বড়।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, মাদক মাফিয়ারা এখন অনেক বেশি কৌশলী। তারা নিজেদের সর্বোচ্চ উপযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিকল্প পথগুলো বেছে নিচ্ছে। তাঁর মতে- অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় অপরাধীদের এই মানসিকতাকে বলা হয় ‘রেশনাল চয়েজ’ বা যুক্তিনির্ভর পছন্দ।