Image description

জ্বালানিসংকট মোকাবিলা ও নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগের যে ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তার মধ্যে ৩২টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ এই কূপগুলো এখন গ্যাস দিতে প্রস্তুত। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ৩২ কূপের মধ্যে ১৬টির ড্রিলিং (অনুসন্ধান ও উন্নয়ন) কাজ শেষ হয়েছে। ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে আরও ১৬টির। এ ছাড়া বর্তমানে কাজ চলছে আরও ৬টি কূপের।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদিত হয়েছে ১৭টি কূপের, আর ডিপিপি অনুমোদনাধীন পর্যায়ে আছে ১৭টি। বাকি কূপগুলোর মধ্যে বেশ কিছু কূপ নির্ভরশীল কূপ, কিছু কূপের পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের পরিধি পরিবর্তন করা হবে, কিছু কূপের উৎপাদন ও কারিগরি অবস্থা বিবেচনা করে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম শেষ করা হবে। এ ছাড়া কিছু কূপের অঙ্গভিত্তিক ব্যয় প্রাক্কলন চলছে। কিছু কূপের সামারি চূড়ান্ত পর্যায়ে। ওয়ার্কওভারের লক্ষ্যে কিছু কূপের ব্যাপারে প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খননকাজের গতি আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কূপগুলো খননে ডিপিপি অনুমোদন পেলে কাজের গতি বাড়বে। 

এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জানিয়েছিলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মোট ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।’ এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ২ সেপ্টেম্বর সংসদে জানিয়েছিলেন, নতুন কূপ খননের লোকেশন চিহ্নিত করতে ব্লক-৭ ও ৯-এ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লাইস কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক ডেটা আহরণ করে উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) মাধ্যমে হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনার ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক ডেটা আহরণের কাজ শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আনুমানিক ১২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার সাইমমিক তথ্য আহরণ শেষ হয়েছে। 

এ ছাড়া বাপেক্সের মাধ্যমে ভোলার চরফ্যাশনের ৬৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, ছাতক দোয়ারাবাজার ও জামালপুরে ৮৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, বিজিএফসিএলের মাধ্যমে তিতাস, হবিগঞ্জ এবং নরসিংদীসংলগ্ন ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি, ২৫৫ লাইন কিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক জরিপ এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লি. (এসজিএফএল) কর্তৃক লাইয়াগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা সাউথ এবং ফেঞ্চুগঞ্জ ওয়েস্ট স্ট্রাকচার-এ ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক জরিপ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ১৫০টি কূপ খনন সম্পন্ন হলে এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে।

৩২ কূপের খনন শেষ : যে ৩২ কূপের খননকাজ শেষ হয়েছে সেগুলোর মধ্যে এসজিএফএলের আওতায় রয়েছে ১৪টি কূপ। এগুলো হচ্ছে বিয়ানীবাজার-১ (ওয়ার্কওভার), কৈলাশটিলা-২ (ওয়ার্কওভার), রশিদপুর-২ (ওয়ার্কওভার), কৈলাশটিলা-৮ (অনুসন্ধান), সিলেট-৭ (ওয়ার্কওভার), সিলেট-১০ (অনুসন্ধান), রশিদপুর-৫ (ওয়ার্কওভার), কৈলাশটিলা-৭ (ওয়ার্কওভার), রশিদপুর-৩ (ওয়ার্কওভার), কৈলাশটিলা-১ (ওয়ার্কওভার), বিয়ানীবাজার-২ (ওয়ার্কওভার), রশিদপুর-১১ (অনুসন্ধান), সিলেট-১১ (উন্নয়ন), সিলেট-১০ এক্স (অনুসন্ধান)।

বাপেক্সের আওতায় শেষ হয়েছে ১১টি কূপ খননের কাজ। এগুলো হচ্ছে ভোলা নর্থ-২ (উন্নয়ন), টবগি-১ (অনুসন্ধান), ইলিশা-১ (অনুসন্ধান), শ্রীকাইল নর্থ-১ (অনুসন্ধান), শরীয়তপুর-১ অনুসন্ধান, সুন্দলপুর-৩ (উন্নয়ন), বেগমগঞ্জ-৪ ওয়েস্ট (উন্নয়ন), জামালপুর-১ (অনুসন্ধান), শ্রীকাইল-৫ (উন্নয়ন), সেমুতাং-৬ (ওয়ার্কওভার), রূপগঞ্জ-১ (ওয়ার্কওভার)।

বিজিএফসিএলের আওতায় শেষ হয়েছে ৭টি গ্যাস কূপ খননের কাজ। এগুলো হচ্ছে তিতাস-২৪ (ওয়ার্কওভার), তিতাস-১৪ (ওয়ার্কওভার), তিতাস-১৬ (ওয়ার্কওভার), হবিগঞ্জ-৫ (ওয়ার্কওভার), বাখরাবাদ-৭ (ওয়ার্কওভার), তিতাস-২৮ (উন্নয়ন) এবং কামতা-২ উন্নয়ন।

খননকাজ চলছে ৬টিতে : বর্তমানে যে ৬টি কূপে খননকাজ চলছে সেগুলো হলো, এসজিএফএলের রশিদপুর-৩-এর অনুসন্ধানকাজ, বাপেক্সের সুন্দলপুর-৪-এর উন্নয়নকাজ, সুন্দলপুর সাউথ-১-এর অনুসন্ধানকাজ এবং ভোলা নর্থ-৩-এর উন্নয়নকাজ, বিজিএফসিএলের তিতাস-৩১ ডিপ অনুসন্ধান এবং তিতাস-২৯-এর উন্নয়নকাজ।

ডিপিপি অনুমোদন হয়েছে যেসব কূপের : যেসব কূপের ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে সেগুলো হলো এসজিএফএলের ডুপিটিলা-১ অনুসন্ধান, কৈলাশটিলা-৯ অনুসন্ধান ও সিলেট-১২ অনুসন্ধান কূপ। বাপেক্সের মোবারকপুর ডিপ-১ (অনুসন্ধান), শ্রীকাইল ডিপ-১ (অনুসন্ধান), ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ (অনুসন্ধান) শাহবাজপুর নর্থ ইস্ট-১ (অনুসন্ধান), শাহবাজপুর-৫ (উন্নয়ন), শাহবাজপুর-৭ (উন্নয়ন), ভোলা নর্থ-৪ (উন্নয়ন), বেগমগঞ্জ-৫ (উন্নয়ন), বেগমগঞ্জ-৬ (অনুসন্ধান) এবং সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপ। বিজিএফসিএলের আওতায় আছে তিতাস-৩০ (অনুসন্ধান), বাখরাবাদ-১১ ডিপ (অনুসন্ধান), বাখরাবাদ-৬ (ওয়ার্কওভার) এবং মেঘনা-১ (ওয়ার্কওভার)।

অনুমোদনাধীন কূপ : ডিপিপি অনুমোদনাধীন পর্যায়ে আছে ১৭টি। এগুলো হলো বিয়ানীবাজার-৩ (অনুসন্ধান), বাতচিয়া-১ (অনুসন্ধান), কৈলাশটিলা-১০ (অনুসন্ধান), জকিগঞ্জ-২ (উন্নয়ন), জকিগঞ্জ-৩ (অনসন্ধান), সুবর্ণচর-১ (অনুসন্ধান), নোয়াখালী-১ (অনুসন্ধান), সুন্দলপুর-৫ (অনুসন্ধান), সেমুতাং-৭ (উন্নয়ন), বেগমগঞ্জ-৭ (মূল্যায়ন), চরলক্ষ্যা-১ (অনুসন্ধান), শাহবাজপুর-৯ (মূল্যায়ন), শাহবাজপুর-১০ (উন্নয়ন), তিতাস-৩২, তিতাস-৩৩ (উন্নয়ন), তিতাস-১৫ (ওয়ার্কওভার), বাখরাবাদ-২ (ওয়ার্কওভার)।

সার্বিক বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, স্থলভাগে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাস কূপ খননে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জন করতে হলে খনন কার্যক্রমের গতি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধানে গ্যাসের উৎপাদনের জন্য যত কূপ খনন করা হবে সেটি ইতিবাচক ফল আনবে। কাজটি কতটা সফলভাবে করা হবে সেটিই মূল বিষয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ১০০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আর অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে মাত্র ১০১টি। বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, আর চারটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ ২০টি ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের পর স্থলভাগে ব্লক বরাদ্দে কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।