Image description

কুমিল্লা শহরে কমপক্ষে ২০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। চলতি বছর ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এই গ্যাং সদস্যদের নাম এসেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় গোটা দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে। এরপরই বুধবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় ৬২৪ জন কিশোরকে আটক করা হয়। তবে যাচাই বাছাই শেষে পুলিশ ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করে। তবে এর আগে দাউদকান্দি মডেল থানার একটি কক্ষের দরজা ভেঙে ১৭ কিশোর পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখানকার কিশোর গ্যাং-এর উত্থানের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এতে তোলপাড় শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, দাউদকান্দিতে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে আটক ২৮ কিশোরের মধ্যে ১৭ জন মডেল থানার একটি কক্ষের দরজা ভেঙে পালিয়ে গেছে। এ সময় ওই কক্ষে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। তবে কিশোরদের পালিয়ে যাওয়া ও থানায় ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, বুধবার দিনভর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ২৮ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের থানার একটি বিশেষ কক্ষে রাখা হয়। এ সময় কক্ষের ভেতরে থাকা কয়েকটি চেয়ার ভাঙচুর করে তারা। পরে আটক ২৮ জনের মধ্যে ১৭ জন পালিয়ে যায়। আটক কিশোরদের স্বজনদের দাবি, তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ-সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড নেই। কিশোরদের আটকের খবর পেয়ে বিকাল থেকে তাদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজন দাউদকান্দি মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে সেখানে হট্টগোল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ওদিকে কিশোরদের পালিয়ে যাওয়া ও থানায় ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।

জানা যায়, ২৮ কিশোরকে আটকের পর তাদের আত্মীয়স্বজন ও উৎসুক জনতা থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে এসে আটকের বিষয়ে জানতে চান। আটক কিশোরদের স্বজনরা থানায় এসেছেন জানতে পেরে ওসি সাজেদুল ইসলাম দ্রুত থানায় আসেন। সেখানে অভিভাবক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন এবং আটক ২৮ কিশোরের সঙ্গেও কথা বলেন। পরে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রসঙ্গত, বুধবার কুমিল্লা জেলা জুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালায় জেলা পুলিশ। জেলার ১৮টি থানায় একযোগে পরিচালিত এ অভিযানে মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে দাউদকান্দির বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৮ জনকে আটক করে থানা-পুলিশ। দাউদকান্দি থানায় কিশোরদের আটকের পরের পরিস্থিতির একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে থানার কক্ষে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কিশোরদের সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লার ১৮টি থানায় গত বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে কিশোর গ্যাং সন্দেহে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মুচলেকায় ৪৫১ অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মামলায় ১৭৩ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং সন্দেহে ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সের কিশোরদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশে কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন স্থানসহ প্রত্যেকটি থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে, যেখানে বখাটেদের উৎপাত রয়েছে ওই সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই অভিযানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন এবং ওয়ারেন্টমূলে ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে??। আমরা দেখেছি, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার উঠতি বয়সের শিশুরা মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এজন্য অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেয়া ও হত্যার ঘটনায় দুই কিশোর গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ঘটনার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি নতুনভাবে সামনে এসেছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তুহিন। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির আড়ালে অন্য কিশোরদের জড়ো করার চেষ্টা ছিল তার। স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রগুলো বলছে, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার অন্য তিন কিশোরের একজন তার সৌদিপ্রবাসী বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনেছে। সেটি দিয়ে ভিডিও বানিয়ে নিয়মিত টিকটকে পোস্ট করা হতো। আরেক কিশোর কিনেছে মোটরসাইকেল। একাধিক ‘গ্যাং পার্টিতেও’ যোগ দিয়েছে অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তরা। তুহিন গত কয়েক মাসে কয়েকটি পার্টির আয়োজন করেছেন বলেও জানান স্থানীয় লোকজন। অবস্থান জানান দিতে সেখানে যোগ দেয়া কিশোর দলকে নিয়ে ফেসবুকে ছবিও পোস্ট করেন।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ভূমিকা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেও। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিমের মা ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেন। সেই ক্ষোভ থেকে তার একমাত্র সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কি না- সেটি তদন্ত করতে হবে। কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি নগরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল।

২০২২ সালের দিকে গিয়ে সেই সংখ্যা হয় কমপক্ষে ২০টি। তবে শাখা দল ও উপদল মিলিয়ে গ্যাংয়ের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তখন সবচেয়ে আলোচিত ছিল রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ঈগল, আরজিএস, র?্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বস। 
ওই সময় ধর্মসাগরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম ও লোগো লেখা থাকতো। গ্যাং সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপ, একই ধরনের পোশাক-চুলের ছাঁট এবং নির্ধারিত আড্ডাস্থল ছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনায় তাদের নাম আসে। এর বাইরে শতাধিক অপরাধের ঘটনায় জড়ায় তারা।

এদিকে কুবি প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ও আশপাশের এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। এ অভিযানে কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। কোটবাড়ী এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির বর্তমান ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, অভিযানটি পুলিশ লাইন থানা থেকে চলমান। শুধু আমাদের থানা এলাকায় নয়, পুরো জেলাতেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চলছে।

তিনি জানান, কোটবাড়ী এলাকা থেকে পুলিশ ফাঁড়ির পক্ষ থেকে ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌথবাহিনীর অভিযানে কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে যুক্ত ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চলমান থাকবে বলেও তিনি জানান। অভিযানের প্রেক্ষাপটে কুবি প্রক্টর অফিস শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। প্রক্টর অফিস সূত্র জানায়, অভিযান চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে চলাচলের সময় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) সঙ্গে রাখতে হবে। মানবজমিনে সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কোটবাড়ী এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এ অভিযান শুরু হলো।