প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, উচ্চ আয়ের বাংলাদেশ কিংবা বৈষম্যহীন সমাজ গঠন সম্ভব নয়। আগামী বাংলাদেশের স্বপ্নও বাস্তবায়ন হবে না। শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়লেও মান, সমতা ও কর্মমুখী দক্ষতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে। গতকাল রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলের লা ভিটা হলে ‘সরকার কতখানি এগোল? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সংলাপে শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি, অভিভাবক, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা এক দিনে, এক রাতে বা ছয় মাসে বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর প্রভাব দেখা যাবে দুই, তিন, পাঁচ বা ১০ বছর পর। আপনারা এখন যা দেখবেন, তাহলো সেই পরিবর্তনের কাজগুলো সঠিকভাবে হচ্ছে কি না?
তিনি বলেন, নতুন শিক্ষক নীতি তৈরি করতে কাজ চলছে, যা অক্টোবরের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়ার কথা রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, ক্যারিয়ার, অ্যাসেসমেন্ট ও ট্রেনিং সম্পর্কিত সবকিছু বাস্তবসম্মতভাবে সাজানো হচ্ছে। স্কুলে মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। ববি হাজ্জাজ বলেন, আমরা আগামী বছর থেকে সব স্কুলে মিড-ডে মিল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। পার্বত্য অঞ্চলেও এ ব্যবস্থা চালু করা হবে। আগামী বছরের মধ্যে রান্না করা খাবারের একটি ছোট পাইলট প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে এখন শিক্ষার তিনটি বড় সংকট স্পষ্ট-অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রসংকটে ভুগছে এবং সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষক হতে চাইছে না। এ অবস্থায় মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি। তিনি আরও বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ বলতে হলে সবার আগে মানসম্মত শিক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হবে। শ্রমজীবী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সন্তানদের জন্য কার্যকর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলা শাখার শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, শিক্ষকদের অভিযোগ, কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে পারছেন না। সমস্যার প্রকৃত কারণ জেনে পদক্ষেপ নিতে হবে। মুখে বললেই পরিবর্তন হয় না; মানুষ তৈরি করার জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, শিক্ষায় শুধু এক্সেস বাড়িয়ে লাভ নেই, শিক্ষা যদি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে পরিণত না হয়, তবে তার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। সাম্প্রতিক জেন্ডার সমতা সূচকে বাংলাদেশ শিক্ষায় এগোলেও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এখনো সমানভাবে শিক্ষায় অংশ নিতে পারছে না।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন-এই চার অংশীজনকে একসঙ্গে ভাবতে হবে। শিক্ষা কমিশন সম্পূর্ণ নির্দলীয় হওয়া উচিত এবং মিড-ডে মিলের মনিটরিংয়ে মায়েদের সম্পৃক্ত করাকে ইতিবাচক উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, যে সমাজে শিক্ষক সম্মান পান না, সেখানে কাজের মোটিভেশনও তৈরি হয় না। তাই শিক্ষকদের পেশাগত অগ্রগতির পথ, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। আমাদের লক্ষ্য, একটি শিশুও যেন শিক্ষার বাইরে না থাকে এবং স্কুলে প্রবেশ করেই সে আনন্দ ও নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রতি গর্ব অনুভব করে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান, রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা প্রমুখ।