Image description

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইবাস++ ও ইআরপি সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সংঘটিত হয়েছে অভিনব আর্থিক জালিয়াতি। হিসাবরক্ষণের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে-সরকারি অফিসের কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেম ‘কালি লিনাক্স’ এবং কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নিতে ‘রিভিলার কি-লগার’ ইনস্টল করা ছিল। যার সহায়তায় চুরি করা ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে আইবাস++ ও ইআরপি সিস্টেমে প্রবেশের পর ভুয়া এনআইডি, অস্তিত্বহীন পেনশনভোগী এবং ভুয়া ব্যাংক হিসাব তৈরি করা হতো। পরে এসব হিসাবের মাধ্যমে সরকারি অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭ বছর চলা এ জালিয়াতিতে সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ঘটনা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ইউজার আইডি অপব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়।

প্রযুক্তিগত প্রমাণেই মিলেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। অর্থাৎ কর্মকর্তাদের অগোচরেই তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এক অদৃশ্য চক্র। হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, পেনশনভোগীদের ভাতার টাকা অডিটেবল (নিরীক্ষা) নয়, সরকার এক বছরের পুরো বরাদ্দ দিয়ে দেয়, এরপর যাঁরা পেনশন পান তাঁদের দেওয়া হয়। কারণ প্রতিনিয়ত পেনশনভোগী যুক্ত হয়, বাদ পড়ে। আর এ সুযোগটাই প্রতারকরা কাজে লাগিয়েছে। সূত্র জানান, ভুক্তভোগীদের মাসিক পেনশন সাধারণত ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে। 

অথচ পাওনা পেনশনের বাইরেও প্রায় প্রতি মাসে একাধিকবার তাঁদের হিসাবে টাকা পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া একটি ফরেনসিক তদন্ত নথি জালিয়াতির চরিত্র সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। নথিতে বলা হয়েছে, কম্পিউটারে ভার্চুয়াল বক্স (ঠরৎঃঁধষ ইড়ী) সফটওয়্যারের মাধ্যমে কালি-লিনাক্স (কধষর-খরহীঁ) নামে একটি বিশেষায়িত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল, যার সাহায্যে সরকারি হিসাবরক্ষণ ওয়েবসাইট রনধং.ভরহধহপব.মড়া.নফ-এ ব্যবহৃত পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব। একই যন্ত্রে সক্রিয় পাওয়া গেছে রিভিলার কি-লগার (জবাবধষবৎ কবুষড়মমবৎ) নামে আরেকটি সফটওয়্যার, যা কি-বোর্ডে টাইপ করা প্রতিটি বর্ণ গোপনে রেকর্ড করে রাখে।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, এ প্রযুক্তিগত অনুপ্রবেশই জালিয়াত চক্রকে এমন এক ‘অদৃশ্য শক্তি’ দিয়েছে, যা দিয়ে তারা কার্যত সরকারি কর্মকর্তার পরিচয়ে সার্ভারে ঢুকে নিজেদের ইচ্ছামতো বিল তৈরি, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের কাজ চালিয়ে গেছে; অথচ কাগজে কলমে দায় বর্তেছে ওই কর্মকর্তার ইউজার আইডির ওপরই। সূত্র জানান, কিছু ক্ষেত্রে পেনশনভোগীদের হিসাবে টাকা পাঠানোর পর সেখান থেকে কমিশন রেখে বাকি অর্থ ফেরত নেওয়া হতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে, সেগুলো হলো আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি।

সাধারণত দুই ধাপে প্রায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হতো, যার মধ্যে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন হিসেবে রেখে দেওয়া হতো। দুদকের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু একটি ব্যাংকের দুটি শাখা থেকেই কয়েক মাসের ব্যবধানে আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে ৯ লাখের বেশি টাকা জমা পড়েছে, যে হিসাবের মালিক আবার নিজেই একজন পেনশনভোগী হিসেবে চিহ্নিত। একইভাবে আদনান ও তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবেও লাখ লাখ টাকা জমা পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যার জমাদানকারী হিসেবে বারবার এসেছে একই ব্যক্তির নাম।

একই ধাঁচের আরেক অধ্যায় : প্রধান ঘটনার বাইরেও অনুসন্ধানে হাতে আসা পুলিশি জিডি ও ব্যাংকসংক্রান্ত নথিই ইঙ্গিত দেয় যে একই ধরনের কারসাজি একাধিক জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গার ইউসিবিএল শাখায় একটি হিসাব থেকে ওটিপি (ঙঞচ) ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। আর ঝালকাঠি জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকেও আইবাস++সংশ্লিষ্ট অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে পুলিশ ও ব্যাংকের কাছে পৃথক অভিযোগ পাঠানো হয়। ওটিপি চুরি করে সরকারি হিসাবরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা সরানোর এ প্যাটার্ন মূল ঘটনার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত মহাহিসাবরক্ষণ অফিসের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে সরাসরি দায়ী করা হয় দুজনকে। তাঁরা হলেন সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান এবং উপসহকারী ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে। তাঁদের ইউজার আইডি থেকে পেনশন ও ভাতার বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট অনুমোদন, বিল অনুমোদন এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) সরাসরি প্রমাণ মিলেছে বলে বরখাস্ত আদেশে উল্লেখ করা হয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী ২ সেপ্টেম্বর তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

দুদকের সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফ বলেন, ‘এটি অনেক বড় চক্র। এর কিছু অংশ পাওয়া গেছে। এদের গভীরে যেতে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে।’ রাজবাড়ীর সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, বর্তমানে মেহেরপুরে কর্মরত রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘যারা যে সিস্টেমে জালিয়াতিটা করেছে তা শিখিয়ে দেওয়া। আর তারা কম্পিউটারের মাধ্যমে তা করেছে।’

গভীর রাতে ওটিপি দিয়ে টাকা স্থানান্তর : তদন্তে উঠে এসেছে আইবাস++ ব্যবস্থায় প্রবেশের পর ওটিপি ব্যবহার করেও সরকারি অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। তৎকালীন ক্যাশিয়ার মো. আশরাফুল আলমের ইউজার আইডি ছিল ধধষধস। নথিতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত নথিতে এমন কয়েকটি লেনদেনের সময় পাওয়া গেছে, যেগুলো গভীর রাতে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ভোর ৩টা ৯ মিনিট ও ৩টা ৫৬ মিনিটে ওটিপি পাস করে সরকারি অর্থ স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে। একটি ঘটনায় একক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ১৫ টাকা সহকারী কোষাধ্যক্ষ এবং ভুয়া গ্রাহকদের হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া যায়।

এক এনআইডিতে একাধিক পরিচয় : এ জালিয়াতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একই এনআইডি ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির পরিচয় তৈরি করা। আইবাস++ ও ইআরপি সার্ভারের তথ্য বিশ্লেষণে এমন কয়েকটি এনআইডির সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে মূল সার্ভারের নামের সঙ্গে আইবাসে থাকা নামের মিল নেই। যেমন এনআইডি নম্বর ১৯৬২৫০১৫১৮৯৭৮৫০০-তে ইলেকট্রনিক সার্ভারে নাম রয়েছে ‘জাহানারা বেগম’। কিন্তু আইবাসে একই এনআইডি ‘মোছা. জাহানারা খাতুন’ নামে রূপান্তর করা হয়েছে। আবার ১৯৬৩২৬১০০০১৬৩৩০৫৯ নম্বর এনআইডিতে সার্ভারে ‘বিউটি বেগম’ থাকলেও আইবাসে তা ‘মোছা. জাহানারা খাতুন’ নামে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে ৪২০২৭৭৪৬৫৮ নম্বর এনআইডিতে সার্ভারে ‘ইয়াছমিন আক্তার নিপা’, ১৯৬১৭১১৭৫২০০৫৯৪১৪ নম্বরে ‘মোছা. সাজেদা বেগম’ এবং ১৪৭৬৮২১৭৫৫৫০৪৯৪ নম্বরে ‘ফিরোজা খাতুন’ নাম থাকলেও আইবাসে এসব পরিচয় ‘মোছা. জাহানারা খাতুন’ নামে দেখানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকারি অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থায় ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলো কীভাবে পাশ কাটানো হয়েছিল।

একই এনআইডিতে দ্বৈত পেনশন : তদন্তে আরও একটি অস্বাভাবিক তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৫৮২৫৬৫২৮৪৪৭৬২৪ নম্বর এনআইডি ব্যবহার করে ‘মোছা. জাহেদা পারভীন’ এবং ‘মোছা. জাহানারা খাতুন-২’-এ দুই পরিচয়ে পেনশনসংক্রান্ত লেনদেন দেখানো হয়েছে। এতে পারিবারিক পেনশন, জিপিএফ ও ইএফটি লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। একটি পর্যায়ে ৪১ হাজার ৭৫৫ এবং ৮ হাজার ১৫৫ টাকা উত্তোলনের তথ্যসহ আরও বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ লেনদেনের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।

স্বজনদের হিসাবেও সরকারি অর্থ : জালিয়াতির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ শুধু ভুয়া পরিচয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বজন ও সহযোগীদের ব্যাংক হিসাবেও অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যাশিয়ার আশরাফুল আলমের বোন মোছা. নাদিরা সুলতানার রূপালী ব্যাংকের নওগাঁ শাখার হিসাবে ইএফটির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ওই হিসাবের পাশাপাশি মোছা. ফজিলা ইয়াছমিন ও মোছা. শাহানারা খাতুনের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবেও টাকা যাওয়ার তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে ধাপে ধাপে ৪৯ লাখ ২৩ হাজার ২৩৯ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

পে-অর্ডারেও জালিয়াতি : ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে সরকারি অর্থ সরানোর আরেকটি ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। ধামইরহাটের ইউসিবিএল (ব্যাংক) শাখার একটি পে-অর্ডার ব্যবহার করে চুয়াডাঙ্গা শাখার জুনিয়র অফিসার মো. শাহরিয়ার আলমের হিসাবে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৪৬৫ টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।

১৭ বছরে জালিয়াতির মামলা : ঘটনার সূত্র ধরে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোছা. জাহানারা খাতুন ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ধামইরহাট থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে প্রধান আসামি করা হয় চারজনকে। তাঁরা হলেনসাবেক ক্যাশিয়ার মো. আশরাফুল ইসলাম (৩৮), মোছা. জাহানারা খাতুন (৪৬), মোছা. মাজেদা পারভীন (৪৮) এবং মোছা. শাহিদা খাতুন সীমা (৩৮)। এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছরে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এবং ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে সরকারি কোষাগার থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মাইসফট হ্যাভেন (বিডি) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. মোফাখখারুল ইসলাম পল্লব বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের ই-গভর্ন্যান্স ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সেক্টরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আইবাসে যা ঘটেছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি সিস্টেম গভর্ন্যান্সের একটি ক্লাসিক ব্যর্থতা। আমি আশা করি তদন্ত শুধু জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট সাইবার গভর্ন্যান্স নীতিমালা প্রণয়নেও ভূমিকা রাখবে।’