চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তার দলীয় নেতাকর্মী ও তৎকালীন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তারাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো নিয়ে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণসহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
আজ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঢাকা লকডাউনের কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
এ দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার অফিসার ইনচার্জ মো: রাকিবুল হাসানের অডিও ভাইরাল হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সমর্থিত মাঠপর্যায়ের পুলিশের তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তার কথায় স্পষ্ট- ‘শেখ হাসিনা দেশে এলে এ পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।’ গোয়েন্দাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে, এ ঘটনার পর ওসি রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহারের পর ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জেরার মুখে পড়েছেন ওসি রাকিবুল হাসান। গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, ওসি রাকিবুল হাসানের মোবাইল ফরেনসিক করার পর আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মোবাইলের তথ্যানুসারে দেখা গেছে, ডিসেম্বরকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। পুলিশের মাঠ পর্যায়ের অনেক সদস্যেরও রাকিবুল হাসানের সাথে এসব বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কথপোকথনের সত্যতা পাওয়া গেছে।
আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা নীলনকশা তৈরি করেছেন। যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যতা পাওয়া গেছে গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশান এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলের পর গত শুক্রবার রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায়। অবশ্য ওই মিছিলকে কেন্দ্র করে গুলশানের আলোচিত ডিসি তানভীর ও গুলশান থানার ওসিকে সরিয়ে দেয়া হলেও মাঠপর্যায়ের পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সেদিনের ঝটিকা মিছিল পুলিশকে ম্যানেজ করেই করা হয়েছে। এরপরই গত বৃহস্পতিবার আলোচনায় আসেন ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো: রাকিবুল হাসান।
সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যমে ওসির একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হলে ওই অডিওতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের দুর্বলতার বর্তমান অবস্থা, শেখ হাসিনা কোন কৌশলে ফিরতে পারে তার কথপোকথনে উঠে আসে। ওসি রাকিবুল হাসানের এক অডিও ক্লিপেই পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা যে কতটা দুর্বল তা প্রকাশ পায়।
শুধু তা-ই নয়, পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) গাড়ি চালকের মাধ্যমে সারা দেশের ওসি বদলির বিষয়টিও আলোচনার জন্ম দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক অযোগ্য পুলিশ অফিসারকে ভালো জায়গায় পোস্টিং দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনাকে ফেরাতে খোদ পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যরাই নীলনকশা তৈরি করছেন।
গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া এবং প্রভাবশালী পলাতক কর্মকর্তাদের সাথে পুলিশে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব থাকা অনেক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও আমলাসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো: রাকিবুল হাসানের অডিও ক্লিপে যা বলা হয়েছে তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো : ওসি রাকিবুল বলেন, ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে, কিছু হবে না, কিচ্ছু হবে না, আপনারা তো চিন্তাও করতে পারছেন না রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল।’ ‘ভয় নাই তো, আসা উচিত, ডিসেম্বর দেরি দেখছি, এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না। ওসি রাকিবুল সেনাপ্রধান ও ক্যান্টনমেন্ট নিয়েও বেশ কিছু আপত্তিজনক বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি পুলিশের সিনিয়র অফিসারদের নিয়েও কথা বলেছেন। বলেছেন, আমরা তো বিএনপি করতেছি না, সব সিনিয়র বিএনপি করতেছে। তিনি ওসি পোস্টিং নিয়েও আইজিপির বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আইজিপির ড্রাইভার পোস্টিং করতেছে। আইজিপির ড্রাইভার ওসি পোস্টিং করছে।
গোয়েন্দাদের তথ্যানুযায়ী, গোয়েন্দাদের পাশাপাশি সরকার থেকেও বেশকিছু তদন্ত শুরু হয়েছে পুলিশের মধ্যে। তদন্তে উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। ওই সূত্র জানায়, পুলিশের মধ্যে বর্তমানে চাকরিরত প্রায় আড়াই শ’ পুলিশের সম্পৃক্ততা তারা পেয়েছে। যারা পুলিশে এখনো সক্রিয়। তারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ চক্রের সদস্য। তারা পলাতক ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের কাছে বাহিনীর স্পর্শকাতর গোপন তথ্য পাচার করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত। তাদের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।
গোয়েন্দা তথ্য মতে, এসব কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিসেম্বরকে ঘিরে যে উত্তাপ শুরু হয়েছে তা আশা করি শিগগিরই শেষ হবে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির যে অডিও ভাইরাল হয়েছে তার বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি একটি থানার অফিসার ইনচার্জ হয়েও নিষিদ্ধ দলের পক্ষে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমার মনে হয় ওসি রাকিবুলের ঘটনার পর অনেকেই সতর্ক হবেন।
মাঠ পর্যায়ে এমন অনেকেই নিষিদ্ধ দলের হয়ে কাজ করছেন, তাদের ব্যাপারে আগাম তথ্য পাবেন কিভাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করছে, নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। যারাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করবেন তারা বিপদে পড়বেন। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণসহ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে সে ব্যাপারে পুলিশের ভূমিকা কী- এর জবাবে খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ইউনিট কাজ করছে। যারা এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপির কড়া নজরদারি : ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার ও প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর পাশাপাশি ঢাকা শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের সন্দেহজনক যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীজুড়ে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এ ছাড়া নগরীর নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো এবং পিকেট ডিউটি জোরদার করা হয়েছে। একইসাথে নগরজুড়ে থানা মোবাইল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল ও হোন্ডা পেট্রোলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
যেকোনো বড় ধরনের অপরাধ বা নাশকতা প্রতিরোধে মাঠে ডিবি টিম, সিটিটিসি টিম ও এপিবিএন টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে। নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা অক্ষুণœ রাখতে ডিএমপির প্রতিটি বিভাগ সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
অপর দিকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি) গতকাল রাজধানীর গুলশান, বনানী, তিন শ’ ফিট এবং রাজধানীর আগারগাঁওসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করতে দেখা গেছে।