চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে গুম, আটক, নির্যাতন, হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরো ৪৪টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় আসামি ১৪৪ জন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া আড়াই শতাধিক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে আরো একটি মামলা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনাও রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুমের মামলার ইনভেস্টিগেশন করছি। অচিরেই গুমসংক্রান্ত ১১টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে দাখিল করবে তদন্ত সংস্থা।’
তিনি বলেন, বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ পরিচালনা করছে। তদন্ত সংস্থায় ২৩ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। প্রসিকিউশন টিমেও জনবল বাড়ানো হয়েছে।
২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৪৪টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ১১টি মামলার রায় হয়। এসব রায়ের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তাঁদের পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
২০১৫ সালের শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল-২ অকার্যকর হয়ে যায়। চব্বিশের গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন করা হয়। বিচার কার্যক্রম গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করে সরকার।
পুনর্গঠনের পর দুই ট্রাইব্যুনালে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি মামলার রায় হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বরের রায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাত মামলায় মোট আসামি ছিলেন ৭০ জন। এর মধ্যে ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান ছিলেন দুই মামলার আসামি।
রায় হওয়া মামলাগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন এবং ৩৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুজন খালাস পেয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪৯ জন পলাতক।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছয় মামলায় বিচার, তদন্তে আরো দুটি : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আরো ছয়টি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে র্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল ও ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে দুটি মামলা রয়েছে। মামলা দুটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
বিচারাধীন অন্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। গত ২৭ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র ও জেনোসাইডের মতো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১৬ সালের ২৫ জুলাই কল্যাণপুরের কথিত জঙ্গি আস্তানা ‘জাহাজ বাড়িতে’ অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে হত্যা, একই বছরের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের জয়দেবপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে সাতজনকে হত্যা এবং ২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফে সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগের বিচারাধীন তিন মামলায়ও শেখ হাসিনা প্রধান আসামি।
তাঁর বিরুদ্ধে আরো দুটি মামলার তদন্ত চলছে। এর একটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে। অন্যটি ২০১৪ সালে মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তারেক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার ঘটনায়।
বিচারাধীন ২২ মামলায় ২৭৫ আসামি : বিচারাধীন ২২ মামলার একটি রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজন। গত ১০ জুন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। চার আসামিই পলাতক।