Image description

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের সরাসরি কোনো অংশীদার নয় দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ। কিন্তু যুদ্ধের অভিঘাত তাদের ঘরেও পৌঁছে গেছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের কোটি কোটি নিম্নআয়ের মানুষ নতুন করে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন। আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চার দেশের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় এ সঙ্কটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস- বিশ্বের  মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এসব দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিঘেœর ঝুঁকি বাড়ে। এর প্রভাব প্রথমে পড়ে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ে, পরে ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ এবং দেশটির চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। পাশাপাশি রাশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশ থেকেও ভারত তেল আমদানি করে। ফলে সরবরাহের উৎস তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় হলেও বিপুল আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসায় দেশটিকে আমদানিনির্ভর হতে হয়েছে। বাংলাদেশও স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে চাহিদা পূরণ করতে না পারায় এলএনজি ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। কাতার এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। নেপাল সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানি না করলেও দেশটির পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘœ হলে তার অভিঘাত নেপালের বাজারেও পৌঁছাতে পারে।

বিলাসিতা নয়, খাবার না শিক্ষার প্রশ্ন
পাকিস্তানের করাচির গৃহকর্মী সাজিদা জিব্রানের অভিজ্ঞতা সঙ্কটের গভীরতা তুলে ধরে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে বিদ্যুতের বিল যেখানে প্রায় এক হাজার ৫০০ রুপি ছিল, এখন তা পাঁচ হাজার রুপি ছাড়িয়ে যায়। গ্যাসের বিলও বেড়েছে। সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে সন্তানদের স্কুলের ফি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তার সামনে দাঁড়িয়েছে কঠিন প্রশ্ন- সন্তানদের পড়াশোনা চালাবেন, নাকি খাবারের ব্যবস্থা করবেন।
ভারতের নয়ডার ৬৭ বছর বয়সী নিরাপত্তারক্ষী বালেন্দ্র সিংয়ের পরিবারও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে পারছে না। শহরের বাড়তি ব্যয় কমাতে পরিবারের কয়েকজনকে লখনউয়ের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। যাতায়াতের সামান্য বাড়তি ব্যয়ও তার মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বড় বোঝা। মাছ খাওয়ার পরিমাণ কমেছে, রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহারও কমাতে হয়েছে। একপর্যায়ে রান্নার জ্বালানি সঙ্কটে কাঠ ব্যবহার করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের ঢাকার গৃহকর্মী আসমা বেগমের আয় মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। তার অভিজ্ঞতায়, মূল্যস্ফীতির চাপে শুধু নিম্নআয়ের মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারও ব্যয় কমাচ্ছে। অনেকে গৃহকর্মী রাখা কমিয়ে দিয়েছেন বা নিজেরাই ঘরের কাজ করছেন। ফলে আসমার মতো কর্মীদের কাজের সুযোগও সঙ্কুচিত হচ্ছে। একই সাথে বরিশালে থাকা তার বাবা, ভাই ও অসুস্থ মায়ের পরিবারও বাড়তি ব্যয়ের চাপে রয়েছে।

নেপালের কাঠমান্ডুর ৫৮ বছর বয়সী মালবাহক জ্ঞানু বাসেন্তের আয়ও অনিয়মিত। ভালো দিনে প্রায় ৫০০ নেপালি রুপি আয় হলেও কাজ কম থাকলে তা ২০০-৩০০ রুপিতে নেমে আসে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারকে প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় একটি অলাভজনক সংস্থা বহন করছে এবং বৃদ্ধ বাবা বয়স্ক ভাতার ওপর নির্ভর করছেন।
যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে যারা যুদ্ধের অংশ নয়
চার দেশের এসব অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের অভিঘাত কেবল জ্বালানি আমদানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তা পরিবারগুলোর খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নি¤œআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস বাড়ানো, কৌশলগত মজুদ শক্তিশালী করা, পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো- এ ধরনের পদক্ষেপই দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার অভিঘাত সীমিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।