Image description
সরেজমিন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট

সারা দেশ থেকে শিশুদের নানাবিধ রোগের জটিলতা নিয়ে অভিভাকরা আসেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটে। হাসপাতালে আসা শিশুরোগীদের বেশির ভাগ রোগের উপসর্গ জ্বর। তার ওপর আছে—এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর ব্যাপক সংক্রমণ এবং হামের সংক্রমণ তো আছেই। আরো আছে—চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড জ্বরসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুরা এসেছে হাসপাতালে।

সকাল সাড়ে ৯টা, শ্যামলী শিশু হাসপাতালের প্রবেশমুখ থেকে দেখা যায় অভিভাকদের ভিড়, মাঝে কিছু স্থানে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক জন। তাদের সবার কোলে শিশু রোগী। একটু সামনে এগোলে দেখা যায় বাইরের খোলা আকাশের নিচেই গাছের একটু ছায়ায় মাদুর বিছিয়ে শুইয়ে দিয়েছে আড়াই বছর বয়সের শিশু ইনসান হাসানকে। শিশুর একপাশে বসা নানি, অন্যপাশে বসা মা, শিশুকে হাতপাখায় বাতাস দিচ্ছেন। জানা যায় তারা গতকাল এসেছেন চাঁদপুর থেকে। তাদের বাড়ি ছায়াবাণীর মোড়ে। জানান, শিশুর ঠান্ডা-জ্বর-কাশি আছে, গতকাল পরীক্ষা করাতে দিয়েছেন চিকিত্সক।

আজকে রিপোর্ট দিলে, চিকিত্সক শিশুর জন্য ব্যবস্থাপত্র দেবে। বাচ্চার মা পিংকি বেগম বলেন, ‘আমার বাচ্চার অন্য সমস্যা আছে—ওর অণ্ডকোষ একটি; এছাড়া ইউরিন ইনফেকশনও আছে।’ আরেকটু ভেতরে গেলে দেখা যায় ছোট্ট এক ফুটফুটে শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা তৃষ্ণা রানী। কী সমস্যা জানতে চাইলে বলেন, আড়াই মাসের রাধিকার খিঁচুনি রোগ আছে; তারা এসেছেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট থেকে। ১৩ বছরের খাদিজাকে নিয়ে নবাবগঞ্জ দোহার থেকে এসেছেন তার মা। মেয়ের জ্বর ভালো হয় না। বলেন, ফামের্সি থেকে ওষুধ এনে খাইলে জ্বর থাকে না, কিন্তু ওষুধ বাদ দিলেই আবার জ্বর আসে। আইজ এক মাস থেকে জ্বর, এখনো ডাক্তার দেখেনি।  

একটু সামনে এগোলে—চোখে পড়ে জরুরি বিভাগের সামনে একটি পিলারে হেলান দিয়ে বসে আছেন এক নারী, কোলে শুকনো লিকলিকে এক শিশু। যার নাম নূর আলম হোসাইন; বয়স তিন বছর। হোসাইনকে কোলে নিয়ে মেঝেতে বসে থাকা নারী, শিশু হোসাইনের নানি। শিশুর মুখ, শরীর শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গেছে। পাশের চেয়ারে বসে আছেন মা জেসমিন। বলেন, ছেলের পেটে টিউমার আছে, কয়দিন থেকে জ্বর, এখন ডাক্তার বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি দিয়েছে, কিন্তু বলছে সিট নেই। সিলেট সোনারবাগ থেকে আসা এই শিশুর বাবা একজন দিনমজুর, শিশুর নানাও এসেছেন সঙ্গে। 

ধীর পায়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পার হয়ে নিচতলা হাম-ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দিকে ঢুকতেই ভেসে আসে কান্নার শব্দ, ভালো করে তাকিয়ে দেখি—একজন মাঝবয়সি নারী বেশ শব্দ করে কাঁদছেন, পাশে দাঁড়িয়ে এক ছেলে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জানা যায়, ঐ নারীর ছেলের বউয়ের এক দিন বয়সি      নানা রোগ নিয়ে বাচ্চা পিআইসিইউতে গতকাল ভর্তি ছিল, আজ সকালে মারা গেছে। ঐ নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন—‘আমার দাদুভাই আর নেই, জন্মের পর তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, আজ সকালে মারা গেছে’।

হাসপাতালটিতে শিশু রোগীর এত ভিড় যে, নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট রোগীর জায়গা না হওয়ায়, যেখানেই সিট খালি হয়েছে, সেখানেই ভর্তি দিয়েছে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ভেতরে একপাশে রয়েছে অন্য রোগের জটিলতা নিয়ে ভর্তি শিশুরা। হরমনজনিত সমস্যা নিয়ে এক শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা, জানতে চাই—বাচ্চার ডেঙ্গু কি-না? তিনি জানান, ‘ডেঙ্গু না, হরমনজনিত সমস্যা’। এই ওয়ার্ডে কেন? জানতে চাইলে বলেন, এইখানে সিট আছে, সেই কারণে এই খানে থাকছি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ডেঙ্গু রোগী ব্যাপক বাড়ছে। জ্বরের এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর—‘এনএস ওয়ান’ পরীক্ষা করে ফেলতে বলেন। তারা বলছেন, “এখন যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে, সরকারিভাবে ডেঙ্গুর পরীক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি। ডেঙ্গু পজেটিভ হলে শিশুদের ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি হবে। ক্রিটিক্যাল ফেসটা হাসপাতালে কাটাতে পারলে ভালো। কারণ তখন রোগীর পালস প্রেসার কমে যায়, ২০ নামলে এর্লামিং, শিশুর বমি হয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, খিঁচুনি হয়, প্লেটলেট কমে যায়, রক্তক্ষরণ যদি শুরু হয়—যেমন স্ক্রিন বা দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত যায়—তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারি। রোগীগুলো বেশি খারাপের দিকে যায় না। এটিকে আমরা বলি ‘এক্সপান্ডেট ডেঙ্গু সিনড্রোম’।” 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘হাম আগের মতো না, তবে হাম বেড়েছে। বিভিন্ন পকেট থেকে রোগী আসে। হামের টিকা পুরোটা আসলে কাভার করতে পারেনি। সবাইকে সচেতন হতে হবে। সরকারকে একা সচেতন হয়ে লাভ হবে না। ৯৫ শতাংশ টিকার কাভারেজ না হলে হার্ড ইমিউনিটি হয় না। ৯৫ শতাংশ কাভারেজ না হওয়া পর্যন্ত হামের এমন সংক্রমণ চলতেই থাকবে।

আগে হাম না থাকার কারণ হচ্ছে—আমাদের কাভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে ভ্যাকসিন দেওয়ার রেট ছিল। কিন্তু সেটা বিভিন্ন সময় টিকার কাভারেজ কমতে কমতে ৬০ শতাংশে নেমে এসেছিল। আমরা এক মাসের বাচ্চারও হামের সংক্রমণ পাচ্ছি। আমরা আগে যেটা বলতাম, মায়ের দুধ না খেলে বাচ্চার শরীরে এন্ডিবডি তৈরি হবে না। অনেক শিশু বাইরের দুধ খায়, তাদের ইমিউনিটি নেই। অনেক বাচ্চার মাও অপুষ্টির শিকার। তাদের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে গেছে, নিজেরাই অপুষ্ট, সেই মায়ের বাচ্চা আরো অপুস্টির শিকার। ঐ বাচ্চারা জন্মগতভাবেই অপুস্টির শিকার—এই বাচ্চাগুলো কিন্তু জন্মের পর এক-দুই, তিন-চার মাস বয়সে আক্রান্ত হচ্ছে হামে। এটা হচ্ছে অপুস্টির কারণে। এটা দেখে বোঝা যায় আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভালো না; বাচ্চাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো না।’ এই শিশু বিশেষজ্ঞ আক্ষেপ করে বলেন, ‘ব্রেস্ট ফিডিংয়ে আমরা আগাইনি, মায়েদের স্বাস্থ্যও আমরা ভালো করতে পারিনি, পরিবেশও আমাদের ভালো না।