ফেনসিডিলের চোরাচালান ঠেকাতে ভারত সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। চলছে নিয়মিত অভিযানও। তারপরও থেমে নেই মাদক চোরাচালান। ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে এখন সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে নতুন নতুন নামের ‘কাশির সিরাপ’। কয়েকটি সীমান্ত এলাকা থেকে চলতি বছর ৪-৫ লাখ বোতল সিরাপ জব্দ করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ (বিজিবি) বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ নিয়ে সম্প্রতি ভারতের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোকে (এনসিবি) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ওই চিঠিতে সীমান্তের ওপারে ফেনসিডিল ও কোডিনযুক্ত সিরাপের অবৈধ কারখানা এবং মাদক কারবারিদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, নতুন নতুন নামের নেশার সিরাপ সীমান্ত দিয়ে পাচার করছে মাদক কারবারিরা। বিষয়টি ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেনসিডিলের নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন ওষুধের নামে কোডিনযুক্ত সিরাপ বাংলাদেশে পাচার করছে ভারতীয় মাদক কারবারিরা। এর মধ্যে রয়েছে ফেয়ারডিল, এস্কাফ, ব্রোনোকফ সি, উইনকোরেক্স ও চোকো প্লাস। ব্রোনোকফ সি সিরাপে কোডিন ফসফেট থাকার তথ্য ভারতের ওষুধসংক্রান্ত নথিতেও পাওয়া গেছে।
ভারতকে দেওয়া চিঠিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতের ১০টি এলাকায় অন্তত ৬২টি অবৈধ কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব কারখানায় কোডিনযুক্ত সিরাপ উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে—এমন অন্তত ৩৭৪ জন ভারতীয় নাগরিকের তথ্যও পেয়েছে বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও মালদহ এবং ত্রিপুরার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল, সিপাহিজলা, বিলোনিয়া ও শান্তিরবাজারসহ মেঘালয়ের কয়েকটি এলাকায় এসব অবৈধ কারখানা থাকার তথ্য রয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহীর সীমান্তবর্তী এলাকায় চোকো ও এস্কাফ নামে ভারতীয় কাশির সিরাপের বিস্তার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় মাদকসেবীদের কেউ কেউ এসব সিরাপকে ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বোতলের গায়ে নাম পরিবর্তন হলেও এসব সিরাপে নেশার উপাদান হিসেবে কোডিন থাকছে। আর এ কারণেই এসব সিরাপকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রোনোকফ সি সিরাপের প্রতি ৫ মিলিলিটারে ১০ মিলিগ্রাম কোডিন ফসফেট এবং ৪ মিলিগ্রাম ক্লোরফেনিরামিন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ভারতের ত্রিপুরায়ও চলতি বছরের জুলাইয়ে বিপুল পরিমাণ ফেয়ারডিল ও এস্কাফ কাশির সিরাপ জব্দের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একটি পণ্যবাহী ট্রেন থেকে ৫৫ হাজার ৬২৬ বোতল সিরাপ জব্দ করা হয়। এগুলো বাংলাদেশে পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল বলে জানা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, এসব সিরাপের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন এলাকার অবৈধ কারখানাগুলো যুক্ত। কারখানায় উৎপাদনের পর সীমান্তপথে এসব সিরাপ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। ফলে বৈধ ওষুধের আড়ালে কোডিনযুক্ত সিরাপের অবৈধ চালান বাংলাদেশে ঢুকলে তা শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এসব মাদকের সঙ্গে অন্তত ৩৭৪ জন ভারতীয় নাগরিকের যোগাযোগ থাকার তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তবে এসব ব্যক্তির প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা কেউ উৎপাদন, কেউ সরবরাহ, কেউ পরিবহন কিংবা অন্য কোনো পর্যায়ে যুক্ত কি না, সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, মাদক কারবারিরা নতুন নতুন কৌশলে এগোবে। তবে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো যে ওষুধ নয়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, সীমান্তবর্তী জেলার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সভায় বিষয়গুলো নিয়মিত জানানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনও এ বিষয়ে কাজ করছে।