Image description
জেলা পুলিশে উদ্যোগে ১৭৫ মামলায় ২৩৫ আসামির ডোপ টেস্ট করানো হয় শরীরে মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া ২২২ জনকে সংক্ষিপ্ত বিচারে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড থানার ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা ডোপ টেস্টের খরচ বহন করছেন

প্রকৃত মাদকসেবী ও কারবারিদের শনাক্ত এবং দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নিয়েছে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ। সীমান্তসংলগ্ন জেলাটিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে গত ১৪ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭৫ মামলায় ২৩৫ আসামির ডোপ টেস্ট করানো হয়। নমুনা পরীক্ষায় তাঁদের মধ্যে ২২২ জনের শরীরে মাদকের অস্তিত্ব মেলে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আসামিদের সংক্ষিপ্ত বিচারের (সামারি ট্রায়াল) আওতায় আনা হয় এবং ১৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই উদ্যোগ অর্থসংকটে পড়েছে। থানা ও জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলার আসামিদের এই ডোপ টেস্টে সাফল্য মিললেও এ ক্ষেত্রে সরকারি কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। সরকারি হাসপাতালে প্রতিটি টেস্টের জন্য ৯০০ টাকা ফি দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) ব্যক্তিগতভাবে এই খরচ বহন করছেন। ভবিষ্যতে অনুদান বা বরাদ্দ পেলে তাঁদের অর্থ ফেরত পাবেন, এমন আশায় এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার (এসপি) মিয়া মোহম্মদ আশিস বিন্ হাছান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সমাজের মানুষ, বিভিন্ন পরিবার থেকেও চাইছে মাদকসেবীরা শনাক্ত হোক এবং আইনের আওতায় আসুক। সে কারণেই ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই কাজে আমাদের সরকারি কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই নিজেরা খরচ বহন করছেন। বরাদ্দ বা অনুদান পেলে এই টাকা তাঁরা ফেরত পাবেন। তবে ঠিক কবে, তা বলা যাচ্ছে না।’

পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত ৫৬ দিনে ২২১ জনকে সংক্ষিপ্ত বিচারের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৫ মামলায় ৫০ জন, শৈলকুপায় ৭৮ মামলায় ৮৫ জন, হরিণাকুণ্ডুতে ৮ মামলায় ১২ জন, কালীগঞ্জে ২৩ মামলায় ২৯ জন, কোটচাঁদপুরে ৮ মামলায় ১০ জন এবং জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ২৩ মামলায় ৩৫ জনকে সংক্ষিপ্ত বিচারে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

থানা-পুলিশ জানিয়েছে, মাদক কারবারি, সেবনকারী কিংবা মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক বা গ্রেপ্তার সবার ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে। নমুনা পরীক্ষায় তাঁদের শরীরে মাদকের অস্তিত্ব পেলে সংশ্লিষ্টদের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ডোপ টেস্টের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল ছাড়া জেলার অন্য কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ল্যাব, কিট ও অন্যান্য সুবিধা নেই। এ জন্য আসামিরা জেলার যে উপজেলারই হোক, তাঁদের জেলা সদর হাসপাতালে এনে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে ‘আগামীর শৈলকুপা’ সংগঠনের পক্ষ থেকে শৈলকুপা থানায় ৪২ হাজার টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৭০টি টেস্টের খরচ বহন করা হয়। পাশাপাশি একটি পার্ক কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসক কিছু আর্থিক সহযোগিতা দিতে চেয়েছেন।

কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গৌরাঙ্গ কুমার বসু বলেন, ‘মাদক মামলার আসামিদের ডোপ টেস্ট করানোর জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। এখন পর্যন্ত প্রতিটি টেস্ট নিজেরা অর্থ দিয়ে করিয়েছি। কত দিন এভাবে পারব, জানি না।’

শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ‘শুধু আগামীর শৈলকুপা নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ৪২ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছি। উদ্যোগটি অব্যাহত রাখার জন্য সংগঠনটি আরও কিছু সহযোগিতা দিতে চেয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ সামান্য। ফলে আমরা নিজের পকেট থেকে কত টাকা এভাবে খরচ করতে পারব, জানি না। খরচের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততেও পারব না। সরকারি অর্থ বরাদ্দ না দিলে একসময় আমরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলব।’

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে প্রতিদিন ২০-৩০টি করে ডোপ টেস্ট পরীক্ষা হয়। এর মধ্যে চার-পাঁচজন করে পুলিশ আসামি নিয়ে আসে। ডোপ টেস্ট কিটগুলো সরকারি এমএসআর সামগ্রীর মাধ্যমে বরাদ্দ হয়। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য সরকার-নির্ধারিত ৯০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। এই টাকা পরে রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়।’

অর্থসংকটের প্রসঙ্গে ঝিনাইদহের এসপি মিয়া মোহম্মদ আশিস বিন্ হাছান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বা অনুদান না পেলে পুলিশ সদস্যদের আগ্রহ হারানোটা স্বাভাবিক। তখন ডোপ টেস্ট ও শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের সামারি ট্রায়ালে হাজির করা সম্ভব হবে না। গতানুগতিক মামলা হবে।’

এসপি বলেন, ‘বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরে এখনো জানানো হয়নি। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের গঠিত কমিটির ঝিনাইদহের তদারকির দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মহোদয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে যদি ডোপ টেস্ট ফ্রি করে, তাহলেও ভালো হয়।’