ভবন নির্মাণে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি হিসেবে পেতে হয় নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে অবনতি। অনিয়মের কারণে চার বছর পদোন্নতি স্থগিত থাকে। কর্মস্থলে সময়মতো না আসা, সহকর্মীদের সঙ্গে বাজে আচরণের জন্য দেওয়া হয় কারণ দর্শানোর নোটিশ। তদবির বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে খুলনা মহানগর বিএনপির নেতারা কেন্দ্রে চিঠি পাঠান। তবে এরপরও থামানো যায়নি তাঁকে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়েছেন খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক।
আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল। বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি।
যত উত্থান তত অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরিফুল ইসলাম জুয়েল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তাঁর তত্ত্বাবধানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এই ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। খুবি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত ওই কমিটির তদন্তে উঠে আসে, ভবনের ছাদের নকশায় কংক্রিটের পুরুত্ব থাকার কথা ছিল সাড়ে ৫ ইঞ্চি। সেখানে কোথাও মাত্র ৩ ইঞ্চি, কোথাও মাত্র ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি রয়েছে। এতে স্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।
তদন্তে উঠে আসে, ছাদ ঢালাইয়ের সময় বিদেশে থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে কোনো কিছু যাচাই না করে অনুপস্থিত কালের এমবি (নির্মাণকাজের নথিতে) স্বাক্ষর করে অন্যায়ভাবে বিল পরিশোধের জন্য ঠিকাদারকে সাহায্য করেছেন আরিফুল ইসলাম জুয়েলসহ সাতজন। এ কারণে সাতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব, নেতারা অতিষ্ঠ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রভাব খাটানো শুরু করেন জুলাই অভ্যুত্থানের পর। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে যে সাজা দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করান তিনি। ২০২৫ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
তবে জুয়েল এখানে থেমে যাননি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা ছিল এটাই প্রথম। গত ২৮ জুন ওয়াসায় যোগ দেন তিনি।
অবশ্য আরিফুল ইসলাম জুয়েল সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও শাস্তি দেওয়া হয়। অভ্যুত্থানের পর সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও আমাকে পদোন্নতি দিয়ে ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
জুলাইয়ে ভাগ্য বদল
সূত্র জানায়, অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ও অ্যাবের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে খবরদারি শুরু করেন জুয়েল। দপ্তরগুলোতে বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। নানা অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে ২০২৫ সালে অ্যাব সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে চিঠি লেখেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।
চিঠিতে বিএনপি নেতারা উল্লেখ করেন, ‘গত ৭-৮ মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ আসছে, দলের পদ ব্যবহার করে আরিফুল ইসলাম জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকিধমকি, নিয়োগ পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেবেন বলে তদবির করছেন। এতে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’
তবে এসব অভিযোগে কোনো কাজ হয়নি। ওয়াসায় নিয়োগ পেয়ে দুজনকে হটিয়ে নিজেই নিয়েছেন ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের ফেজ-২ পরিচালকের দায়িত্ব।
আরও যত অভিযোগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কর্মস্থলে দেরি করে উপস্থিত হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে অসংখ্যবার তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার তিন মেয়াদে একাধিকবার শোকজ পেয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের মধ্যে তিনি ৫৪ দিনই দেরিতে অফিসে উপস্থিত হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন তিনি। এ নিয়ে গত ৪ মার্চ তাঁকে আবার শোকজ করা হয়।
ওয়াসায় তুঘলকি কাণ্ড
খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পর জুয়েল নিয়মিত কার্যালয়ে যান না। উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দেন না। সূত্রটি জানায়, ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে তদবির করিয়ে জুয়েলই এই কাজ করেন। তবে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে। তবে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে এখন জুয়েল প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছেন।
জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহ বলেন, ‘পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এখানে আমার কিছু বলার নেই।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যর্থতা, বিল ভোগান্তি, সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ সব মিলিয়ে ওয়াসা অথর্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটিকে সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিত ব্যক্তিরা জায়গা পেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।