দেশের গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। উপজেলা হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীদের ভিড় জমে উঠেছে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে শহরমুখী হচ্ছেন।
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় দেড় মাসে তিন শতাধিক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছেই। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই তরুণ বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্ষা ও সাম্প্রতিক বন্যা-পরবর্তী সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও তীব্র আর্দ্রতার কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ায় ডেঙ্গু গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে চিকিৎসকেরা মনে করছেন।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গত ৪৫ দিনে অন্তত ১৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর বাইরে স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু পজিটিভ হয়েছেন এবং চিকিৎসা নিয়েছেন—এমন রোগীর সংখ্যা দেড় শতাধিক বলে জানা গেছে। ফলে প্রকৃত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের নথিভুক্ত রোগীর চেয়ে আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় মাসে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৮ জন এবং বহির্বিভাগে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন; বেসরকারি হাসপাতাল জরিপে বাঁশখালী জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে ১৬ জন, বাঁশখালী ন্যাশনাল হাসপাতাল লিমিটেডে ছয়জন, বাঁশখালী মাতৃসদন ও মা-শিশু জেনারেল হাসপাতালে দুজন, অ্যাপোলো হাসপাতাল লিমিটেডে আটজন, জলদী আধুনিক হাসপাতাল লিমিটেডে ১৬ জন, গুনাগরি আধুনিক হাসপাতালে ১৮ জন, গুনাগরি মা-শিশু জেনারেল হাসপাতালে ১৩ জন, গুনাগরি আয়েশা সিদ্দিকা হাসপাতালে সাতজন, উপকূলীয় জেনারেল হাসপাতালে একজন এবং পুকুরিয়া সিভি হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিধনে দৃশ্যমান কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বাঁশখালী পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড বা বিটিআই প্রয়োগ এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কারের কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বাঁশখালী পৌরসভা, বৈলছড়ী, কালীপুর, চাম্বল, শেখেরখীলসহ কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুমিনুল হক বলেন, ‘বাঁশখালীতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য পাঁচটি ব্লক রয়েছে। এর বাইরেও ১০-১১টি আলাদা বেডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত হাসপাতালে ৪৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন। অনেকে হোম ট্রিটমেন্ট নিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, বাঁশখালীতে বয়ে যাওয়া বন্যা ও বর্ষার সিজন থেকে জমে যাওয়া পানি থেকে এ মশা ছড়াচ্ছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, পিরোজপুর জেলায় ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলার কাউখালী উপজেলা সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যা ও জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গু-আক্রান্ত রোগীরা শয্যা সংকটে করিডোর ও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মশারির ভেতরে থাকলেও এতে সাধারণ রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু-আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর ভেতরে ১৪৭ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালে ১৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। সম্প্রতি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কাউখালীর এক স্কুলশিক্ষকের বরিশালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এ ছাড়া আউটডোরে চিকিৎসাপত্র নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। তবে তুলনামূলকভাবে জেলার ভেতরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগের চেয়ে কাউখালীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুব্রত কর্মকার বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন এবং বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট রাখা হয়েছে। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেহানা আক্তার বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জলাশয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মশক নিধন অভিযান চলছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৯ জন এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডে নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জরিপ চালিয়ে নাসিকের ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হটস্পটগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তিন-চার মাস ধরে নগরজুড়ে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৫০০ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও এখন পর্যন্ত কেউ মারা যাননি। কোনো এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে ওই এলাকার ২০০ গজের মধ্যে বিশেষভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. এসএম সাখাওয়াত হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ৬১৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৩১ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ডের মাঠকর্মীদের হ্যান্ড গ্লাভস, গামবুট, মাস্কসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে হ্যান্ড মাইক ও দুটি হ্যান্ড স্প্রে বিতরণ করা হয়েছে।