চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও একবার বিদ্যুৎ গেলে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে। অথচ রাত নামলেই নগর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিং গ্যারেজগুলোয় বেড়ে যায় বিদ্যুতের ব্যবহার।
অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যারেজের বড় একটি অংশে আবাসিক মিটারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক পরিমাণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। কোথাও অনুমোদিত লোডের সীমা ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে সংযোগ, আবার কোথাও বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে তার টেনে দেওয়া হচ্ছে ব্যাটারি চার্জ। অবৈধ সংযোগ টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের সঙ্গে গ্যারেজ মালিকদের যোগসাজশ রয়েছে। মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা, বিচ্ছিন্ন করার পর আবার সংযোগ দেওয়া এবং মিটার বাইপাস করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নগর ও আশপাশের এলাকায় অটোরিকশার মোট সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। একেকটি রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে দৈনিক গড়ে ৬-৮ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে দেড় লাখ রিকশার জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ৯ লাখ থেকে ১২ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে এ বিদ্যুতের দৈনিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ কোটি থেকে ৫২ কোটি টাকা। বছরে সম্ভাব্য ৪৭৬ কোটি থেকে ৬৩৫ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো কোনো গ্যারেজে বৈধ মিটার থাকলেও তার অনুমোদিত ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি লোড ব্যবহার করা হচ্ছে। আবাসিক মিটারে একসঙ্গে একাধিক রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার আবাসিক সংযোগের আড়ালে চলছে কার্যত বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অবৈধ চার্জিং ব্যবসার সঙ্গে গ্যারেজ মালিক, বিদ্যুৎ সংযোগের দালাল, রিকশা মালিক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশের যোগাযোগ রয়েছে।
চান্দগাঁও থানার বিসিক এলাকার এক গ্যারেজ মালিক বলেন, ‘মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয় বিদ্যুতের লোকজনকে। যাতে লাইন কেটে না দেয়। আবাসিক মিটার ব্যবহার করেই বেশি যানবাহন চার্জ দেওয়া যায়।’
ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে হাজার হাজার নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা জড়িত। রিকশাচালক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আধাবেলা রিকশা চালালেই দিনে ১৫ থেকে ১৬টি ট্রিপ দিয়ে প্রায় এক হাজার টাকা আয় করা যায়। গ্যারেজগুলোয় এখন ব্যাটারিচালিত রিকশাই বেশি। চালাতে আরাম, আয়ও ভালো।’
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক শাহজালাল মিয়া বলেন, ‘মূল সড়কে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা চলায় নিবন্ধিত সিএনজি চালকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশীদ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যাতে নগরের প্রধান সড়কে চলাচল করতে না পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী (বিতরণ দক্ষিণাঞ্চল) কামাল উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধ সংযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে আগের তুলনায় বর্তমানে অভিযানের সংখ্যা কমে এসেছে।’
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মনজুর আলম বলেন, ‘এ খাত থেকে বিশাল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন হওয়ায় কার্যকর আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রিকশার ব্যাটারি চার্জ কীভাবে হবে এবং সেই বিদ্যুতের মূল্য কে দেবে, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়।’