Image description
চলতি বছরে মৃত্যু ১৭৬ জনের

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের তুলাতলী এলাকার বাসিন্দা রাফসান (২৬)। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। রাফসানের বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। তার বিয়ের জন্য পাত্রীও দেখছিল পরিবার। কিন্তু সব আয়োজন বৃথা হলো রাফসানের জ্বরে! তীব্র জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। শুরুতে বিষয়টি প্রশ্রয় না দিলেও অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম শহরের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানেই তিনি ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এলাকার মানুষের আক্ষেপ রাফসানের যেখানে বর সেজে নববধূকে নিয়ে ঘরে ফেরার কথা। সেখানে তার নিথর দেহ অন্যের কাঁধে ভর করে গেলেন অনন্ত যাত্রায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশ কিছুদিন জ্বরে ভোগার পর রাফসানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার আরও অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। এ চিত্র শুধু রাফসানের একার নয়। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এসময় মারা গেছেন ১৭৬ জন। যাদের অধিকাংশেই যুবক। শুধু রাফসানের বয়সী (২৬-৩০ বছর) মারা গেছে এ বছরের সর্বোচ্চ ২৩ জন! বয়সভিত্তিক হিসেবে ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মারা গেছে মোট মৃতের ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেন, ডেঙ্গুতে যুবকদের মৃত্যুর কারণ সুনির্দিষ্টভাবে এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে এ বয়সী রোগীরা বেশি বাইরে থাকেন। তারা কর্মস্থল ও যাতায়াতের পথে ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এ ছাড়া যুবকরা জ্বরাক্রান্ত হলে চিকিৎসায় অবহেলা করেন। এসব কারণেও তারা বেশি আক্রান্ত ও মারা যেতে পারেন। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলার জন্য গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী বাড়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না; রোগীর সংখ্যা কমানোর জন্য এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর সার্ভেইল্যান্স জোরদার করতে হবে। ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে কোন বয়সে কতজন মারা যাচ্ছে, শুধু এই সংখ্যা দিয়ে মৃত্যুঝুঁকি নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ প্রতিটি বয়সগোষ্ঠীতে কতজন আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে যদি মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোন পর্যায়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন, তাদের শারীরিক জটিলতা কী ছিল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোথায় ঘাটতি ছিল মৃত্যুর পর্যালোচনায় এসব তথ্য বের করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু মৌসুমি কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা—সবগুলো একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার পার্থক্য থাকলে তা মৃত্যুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি মৃত্যুকে গুরুত্ব দিয়ে ডেথ রিভিউ এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৯ হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৮৩৮ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ৭৪৬ জন। এ সময় মারা গেছেন ১৭৬ জন।

সরকারি হিসেবে মৃত ১৭৬ জনের মধ্যে বয়সভিত্তিক হিসেবে দেখা যায়, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী মারা গেছে ৭ জন। ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১৪ জন, ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২৩ জন, ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ১৭ জন, ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী ১৯ জন এবং ৪১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১৪ জন। ১৬-৪৫ বছর বয়সীই মারা গেছেন ৯৪ জন। শতাংশের হিসেবে মোট মৃত্যুর ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশই ১৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ২৬-৩০ বছর বয়সীদের: বয়সভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীদের। এ বয়সে মারা গেছেন ২৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী রোগীরা। এ বয়সে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। মোট মৃত্যুর ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। মোট মৃতের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২১-২৫ এবং ৪১-৪৫ বছর বয়সী দুই গোষ্ঠীতেই মৃত্যু হয় ১৪ জন করে, যা প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে মোট মৃত্যুর প্রায় ৮ শতাংশ। এ ছাড়া ১৬-২০ বছর বয়সী মারা গেছেন ৭ জন। যা মোট মৃত্যুর ৪ শতাংশ।

ভর্তি রোগীর হিসাবেও যুবারা এগিয়ে : শুধু মৃত্যুর হিসেবে নয়, ভর্তি রোগীর হিসেবেও যুবারা এগিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বয়সভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ১৬-২০ বছর বয়সী ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৫৫ জন। ২১-২৫ বছর বয়সী ৮ হাজার ৫৮০ জন, ২৬-৩০ বছর বয়সী ৮ হাজার ৪৫১ জন, ৩১-৩৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৮৪৫ জন, ৩৬-৪০ বছর বয়সী ৫ হাজার ২৩৪ জন এবং ৪১-৪৫ বছর বয়সী ৩ হাজার ৭৯১ জন। এ ছয়টি বয়সগোষ্ঠী মিলিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৯৫৬ জন।

সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে ভয়ংকর ডেঙ্গু : ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অবনতি হয় সেপ্টেম্বরে। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই সেপ্টেম্বর মাসে দ্রুত বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে, সেপ্টেম্বরের ১৮ দিনে রোগটি শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ২৩ হাজার ৩০১ জন। এসময় মারা গেছেন ৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী। মাসের হিসাবে এ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরই সবচেয়ে বেশি রোগী ও মৃত্যু হয়েছে। এর আগে আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জুলাইয়ে ভর্তি হয়েছিল ৯ হাজার ২০৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের।

পুরুষের চেয়ে ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যু বেশি : ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৭৬ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের তুলনায় ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুই বেশি। মোট মৃত্যুর মধ্যে ৯২ জন নারী, আর ৮৩ জন পুরুষ। তার মধ্যে ২৬-৩০ বছর বয়সী মারা গেছে ১৪ নারী ও ৯ পুরুষ। ৩১-৩৫ বছর বয়সী ১০ নারী ও ৭ পুরুষ। ৩৬-৪০ বছর বয়সী ১১ নারী ও ৮ পুরুষ।