Image description

হামের প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণের উৎস নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ এক তথ্য পাওয়া গেছে। হাম আক্রান্তদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো না-কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র থেকে সংক্রমিত হয়েছে। বিপরীতে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বা ৫২ জন শিশু আগে হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস ছিল। তথ্যটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। 

‘মিজলস আউটব্রেক ২০২৬ ইন সাদার্ন বাংলাদেশ : এপিডেমিওলজিক্যাল প্রোফাইল, ক্লিনিক্যাল ক্যারেক্টারিস্টিকস, জেনেটিক অ্যানালাইসিস উইথ ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড অ্যান্টিবডি স্ট্যাটাস’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়। এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণাটির ফলাফল গতকাল চমেকের কনফারেন্স হলে প্রকাশিত হয়। মূল গবেষক ছিলেন চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার। গবেষণা সহযোগী ছিলেন ডা. সেলিনা হক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. মোহাম্মদ জাবেদ বিন আমিন চৌধুরী, ডা. সায়েদা হুমায়দা হাসান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডা. আসমা ফেরদৌসী ও ডা. সানজানা ইসলাম, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. এম এস জামান।  

গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি মোট ৩০০ আক্রান্ত শিশুর তথ্য গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হাসপাতালভিত্তিক রোগী তথ্যের মধ্যে চমেক হাসপাতালের ৯৭ জন, মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪৫ জন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৪ জন এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ জন শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আক্রান্ত শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত। এর মধ্যে ৬ মাসের কম বয়সি ছিল ১১ শতাংশ বা ২৩ জন। ৯ মাসের নিচে, নিয়মিত হাম টিকার নির্ধারিত বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে ৪৬ শতাংশ বা ৯১ জন শিশু। ১ থেকে ৫ বছর বয়সি ছিল ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৪৬ জন। গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের আর্থসামাজিক অবস্থাতেও ঝুঁকির চিত্রও দেখানো হয়। ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১৪৮ জন শিশু গ্রামীণ কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার। ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ বা ১২৭ জন শিশু ছিল নিম্ন আর্থসামাজিক পরিবারের। অর্থাৎ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা হামের প্রাদুর্ভাবে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে ছিল।

মূল গবেষক ডা. কামরুন নাহার বলেন, গবেষণায় দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার পেছনে অপুষ্টি বড় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের ৪৬ শতাংশই হাম প্রতিরোধের নিয়মিত টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়স ৯ মাসে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝারি ও তীব্র অপুষ্টি ছিল হামের মারাত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরির প্রধান কারণ। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়া শিশুদের গুরুতর জটিলতায় ভোগার ঝুঁকি টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

গবেষণায় বলা হয়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ, ১৬৭ জন কোনো হাম টিকা নেয়নি। এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়সই ছিল ৯ মাসের কম। টিকা না নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে অসচেতনতা বা টিকা দেওয়ার তারিখ ভুলে যাওয়া। ফলে টিকা না নেওয়া শিশুর হার ছিল ৫২ শতাংশ। এ ছাড়া অসুস্থ থাকা ৩০ শতাংশ শিশু, মায়ের অসুস্থতার কারণে ৮ শতাংশ, টিকার ভয়ের কারণে ৪ শতাংশ, টিকাকার্ড হারিয়ে ফেলার কারণে ৪ শতাংশ শিশু টিকা নেয়নি। তবে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তুলনায় টিকাহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ছিল প্রায় দ্বিগুণ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে একজনেরও মৃত্যু হয়নি। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এমন বয়সের শিশু, যাদের নিয়মিত টিকার বয়সই হয়নি। ফলে ৯ মাসের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে হাম প্রতিরোধে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও গবেষণায় উঠে এসেছে। 

গবেষণায় আরও বলা হয়, হাম আক্রান্ত শিশুদের ৩১ শতাংশ বা ৫১ জন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষণার চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মাঝারি ও তীব্র অপুষ্টিকে হামের গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেবল পুষ্টির ঘাটতিই নয়, শিশুর বুকের দুধ পাওয়ার ইতিহাসও গবেষণায় বিবেচনায় নেওয়া হয়। ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ৩৭ জন শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো হামের তীব্রতা শতভাগ কমাতে সক্ষম নয়। সঙ্গে প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত পুষ্টি।