আম, রেশম, কৃষি, পদ্মা, বরেন্দ্রের বিপুল সম্ভাবনা-সবই আছে রাজশাহীতে। বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ জনশক্তি, মহাসড়ক এবং রেল যোগাযোগও আছে। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কাক্সিক্ষত শিল্পায়নের দেখা মেলেনি এ অঞ্চলে। বড় শিল্পের সংখ্যা হাতেগোনা। নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। ফলে কৃষি ও সেবা খাতনির্ভর অর্থনীতির বাইরে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি।
রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২ ২০২২ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধনের পর প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর প্রায় ৬৪ শতাংশ প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ২০ শতাংশ প্লটেও উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদনমুখী কারখানা গড়ে ওঠেনি। ২০৯টি প্লটের মধ্যে ৬৬ জনের মধ্যে ৭৭টি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৫০ একর জমিতে গড়ে তোলা এই শিল্পনগরী নিয়ে শুরুতে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। উদ্যোক্তা আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ ছিল মূল লক্ষ্য।
কিন্তু অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পরও বিনিয়োগকারীদের বড় অংশকে টানা যায়নি। ফলে শিল্পনগরীর বড় অংশ এখনো কার্যত অনাবাদি জমির মতো পড়ে আছে। রাজশাহী চেম্বারের সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, এখানে শিল্প গড়ে তুলতে যে ধরনের সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে করা উচিত, সেটি কখনোই পাওয়া যায়নি। ব্যাংকগুলোও এখানে শিল্প গড়ে তুলতে সহযোগিতা করে না। বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট বরাদ্দের উদ্দেশ্যই হলো শিল্প স্থাপন। বিসিকের সেবার মধ্যে উন্নত রাস্তাঘাট, পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধাসহ শিল্প প্লট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ঋণসহায়তা, কারিগরি পরামর্শ ও শিল্প স্থাপনে সহযোগিতাও বিসিকের দায়িত্বের মধ্যে আছে।
এমন ব্যবস্থার পরও যদি বছরের পর বছর প্লট পড়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে-সমস্যাটি কোথায়? উদ্যোক্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, শুধু প্লট দিলেই শিল্প হয় না। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, সহজ অর্থায়ন, বাজার, দক্ষ শ্রমিক, দ্রুত অনুমোদন এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের কার্যকর ব্যবস্থা। এসব সুবিধা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগকারীরা জমি নিলেও কারখানা স্থাপনে আগ্রহ হারান। চেম্বারের পরিচালক প্রকৌশলী শাকিলুর রহমান বলেন, প্লট বরাদ্দ দিলেও অন্য সুবিধাগুলো অনিশ্চিত। ফলে ব্যাংক ঋণ নিয়ে যারা প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ কারণে রাজশাহীতে শিল্প গড়ে উঠছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, রাজশাহীর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা কৃষিভিত্তিক শিল্প। আম, টম্যাটো, পান, ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বিশাল উৎপাদন আছে। কিন্তু কাঁচামাল উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাত শিল্প এখনো অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন বলেন, রাজশাহীতে কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে গবেষণা করেও পাওয়া গেছে, রাজশাহীতে টম্যাটো ও পান ঘিরে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হয়। ফলে এখানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোথাও ঘাটতি আছে, যার ফলে কাঁচামাল আছে, বাজার আছে, উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাও আছে, তবুও গড়ে উঠছে না শিল্প।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খানের মতে, রাজশাহীর শিল্পায়নের বাধাগুলো হচ্ছে বড় বিনিয়োগের ঘাটতি। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বৃহৎ উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। শুধু রাস্তা বা বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেই শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয় না। বিসিকের আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজিদ জানান, উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে বিসিক সব সময় কাজ করছে। যারা প্লট বরাদ্দ নিয়েও শিল্প গড়ে তোলেননি, তাদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিল্পনগরীর জমি বরাদ্দ হয়, অবকাঠামো তৈরি হয়, প্রকল্প উদ্বোধন হয়, কিন্তু উৎপাদনমুখী শিল্পের সংখ্যা সেই তুলনায় বাড়ে না। এমনটা কেন হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করতেও কাজ করছে বিসিক।