নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকারের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। যদিও এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী আপত্তি জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী ১২ নভেম্বর শুরু হয়ে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন শেষ হবে আগামী বছর ২৭ মে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের সম্ভাব্য এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। ইউপি নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের অন্যান্য যেমন পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যায় ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের হবে। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগে থেকেই মাঠে কাজ করছে। প্রায় বেশিরভাগ এলাকাতেই দলটি তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করে বিভিন্নভাবে গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও অনেক এলাকায় তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এ ব্যাপারে এখনো নিরব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে দল সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করাটাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখো দেবে। যদিও এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। সে ক্ষেত্রে দল মনোনীত কোন প্রার্থীর বিষয় না থাকলেও পরোক্ষভাবে দল সমর্থিত প্রার্থী থাকবে। আর দেশের প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদেই গড়ে ৭ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী প্রার্থী রয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আসার আগেই এসব প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছেন। এলাকায় জনসংযোগও শুরু করেছেন। ফলে দল-সমর্থিত একক প্রার্থী ঠিক করা এবং অন্যদের তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করাই বিএনপির সামনে বড় কঠিন সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সার সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এসব বিষয় নিয়েও বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে বেশ সমালোচনার মুখে রয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ অন্যান্য দলগুলো এসব বিষয় নিয়ে সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সক্রিয় রয়েছে। তারা লং মার্চ করছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এসব বিষয়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে কঠিন চ্যলেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মোকাবিলার আগে নিজেদের ঘরের প্রার্থী সামলানোই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা, নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি এসব বিষয়ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দলীয়ভাবে পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। যদিও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় কোন প্রতীক থাকছে না। এ জন্য দলীয় মনোনয়নেরও কোন বিষয় নেই। সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তারপরও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলের সমর্থিত প্রার্থী বাছাই করছে এবং ঘোষণা করছে। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও উপজেলায় তাদের সমর্থিত মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আসন্ন স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ১২টি সিটিতে তাদের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে।
তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ১২ সিটি করপোরেশনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী দলের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীর নাম প্রকাশ্যে এসেছে। তার মধ্যে রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ঢাকা উত্তরে সেলিম উদ্দিন (মহানগর উত্তরের আমির), চট্টগ্রাম সিটির শামসুজ্জামান হেলালী (মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক), গাজীপুর সিটির হাফিজুর রহমান (তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক), নারায়ণগঞ্জ সিটির আবদুল জব্বার (মহানগর শাখার আমির), রংপুর সিটির এ টি এম আজম খান (মহানগর আমির)। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মহিলাকর্মীরা সারাদেশে নানাভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে।
এনসিপিও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারা জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন তারা একক ভাবে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দলটিও তাদের সমর্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীর উদ্দিন পাটওয়ারী এবং উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে। এছাড়া এনসিপি সারাদেশে তাদের সমর্থিত আরও ১০০ মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে সরকারি দল বিএনপি এখনো নিরব। দলীয়ভাবে তাদের সমর্থিত কোন প্রার্থীর নাম এখনো তারা ঘোষণা করেনি। তবে বর্তমানে সরকারের নিয়োগ দেয়া যে দুজন দলীয় নেতা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন তারা মেয়র প্রার্থী হিসাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তাদের ব্যাপারে ইতোমধ্যে নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস, মরহুম সাদেক হোসেন খোকার ছেলে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বড় প্রভাব রয়েছে।
এ ছাড়া এ অঞ্চলে নোয়াখালি অঞ্চলের একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেই অঞ্চলের সিনিয়র নেতাদেরও এখানে ভূমিকা থাকতে হবে। সব মিলিয়ে বিএনপিকে দক্ষিণ সিটির প্রার্থী নির্বাচনে এসব বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে উত্তর সিটির বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বিগত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন। পরাজিত সেই ব্যক্তিকে মেয়র প্রার্থী করলে সেটা ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য তা বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নানান অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ঢাকা সিটি ছাড়া সারাদেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদেও দলের অনুমোদন ছাড়াই নিজ নিজ উদ্যোগে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসাবে একাধিক নেতা পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড লাগিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। এই নির্বাচনে সরকারি দল হিসাবে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেবে। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও তাদের অন্যান্য সমমনা দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য এখনো প্রস্তুতি শুরু করেনি ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গুছাতে সময় দিতে পারছেন না। বলা যায় বিএনপি এ বিষয়ে অনেকটা পিছিয়ে আছে। জামায়াত ও এনসিপি এবং অন্যান্য দল তাদের সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে একেক স্থানে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দলীয় কোন্দল মেটানো এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা দলটির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি কেমন ফলাফল করে, তা তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করবে। একই সাথে এই নির্বাচনগুলো মূলত বিএনপির তৃণমূলের নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী এবং তারা জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে কিনা, তা স্পষ্ট করবে।
তবে বিএনপি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছানো এবং যোগ্য ও জনপ্রিয় একক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা। তাদের মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে ক্লিন ইমেজের প্রার্থীদের নির্বাচনে নামানোর কৌশল নিয়ে দলটি এগোচ্ছে। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দূর করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতেও সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমন বিভিন্ন জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের দল-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন। দলটির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের বিষয় নয়, এটি দলকে আবার মাঠে সক্রিয় করারও সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো এবং নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এই তিন চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে দলটিকে। এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় একই পদে একাধিক প্রার্থী দাঁড়ানোর ঝুঁকি আরও বেড়েছে। দলীয় সমর্থন না পাওয়া প্রার্থীরাও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারেন এমন আশঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়। এতে দলীয় মনোনয়নের কোন বিষয় নেই। তাই বিএনপি কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেবে না। তবে তৃণমূলকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, স্থানীয়ভাবে যিনি সর্বজন গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় তাঁকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিকভাবে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতেও দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে। উত্তর সিটিতে সেলিম উদ্দিন ও দক্ষিণে সাদিক কায়েম প্রার্থী হচ্ছেন। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। আশা করছি আমরা তার সুফল অবশ্যই পাব।
এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। এ নির্বাচন আমরা সারাদেশে এককভাবে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করার সুযোগকে কাজে লাগাতে চাই।