বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উচ্চমূল্যের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও দ্রুত কমছে। এ অবস্থায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে নিজস্ব খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের ওপর জোর দিচ্ছে। জ্বালানিসংকটের এই কঠিন সময়ে দেশি কয়লার ওপর ভরসা রাখতে চাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে স্থানীয়রা রাজি হলেই শুরু হবে কয়লা উত্তোলনের কাজ। আর বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলন শুরু হয়েছে। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জেও রয়েছে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি জানান, স্থানীয়দের আয় রোজগার, বসতি ও পরিবেশের বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান করেই এই খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, দেশের কয়লা এমনভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করতে হবে যাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে নিজস্ব কয়লা উত্তোলন করে দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে হবে। মোট কথা, জ্বালানিসংকট সমাধানে কয়লা উত্তোলনে জোর দিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের কয়লা উত্তোলনে ভূগর্ভস্থ ও উন্মুক্ত পদ্ধতি নিয়ে তর্কের মধ্যেই কেটে গেছে বছরের পর বছর।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বছরের পর বছর জ্বালানি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কয়লা উত্তোলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। অথচ বর্তমানে দেশে প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। আর এসব কেন্দ্রগুলো চালাতে সরকারকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করতে হয়। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের বিষয়টিতে জোর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বলেন, ফুলবাড়ীর কয়লা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানের।
কাজেই এই কয়লা উত্তোলন করে যদি জ্বালানিসংকট মেটাতে পারি তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, কয়লা উত্তোলনে এখন প্রধান সমস্যা হচ্ছে সামাজিক প্রেক্ষাপট। বর্তমানে ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনে স্থানীয় ও সামাজিক যে চাপ আছে তা ধীরে ধীরে উন্নতি হলেই কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। এ কয়লাক্ষেত্র নিয়ে আগেই পর্যালোচনা করা হয়েছে। সব ঠিক থাকলে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়াতে নতুন করে আরও ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে স্থানীয়রা মোটামুটি সম্মত হয়েছেন। এখানে বোর হোল করতে হবে। বর্তমানে বিদেশি একটি কোম্পানি এই হোল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে রংপুরের খালাশপীরের বিষয়ে পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি নেই। ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় নতুন ৩০০ একর জায়গা নিয়েই এখন মূল পরিকল্পনা। জামালগঞ্জে কয়লা আছে। কিন্তু সব জায়গাতেই মূল সমস্যা হচ্ছে সামাজিক প্রেক্ষাপট। পেট্রোবাংলার একজন পরিচালক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন নিয়ে বর্তমানে সামাজিক যে বিষয় আছে তা সরকারের পক্ষে এলেই এই ক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু করতে পারব। এখানে জমি অধিগ্রহণের বিষয় আছে। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকা। এটি এখনো সরকারের কাছে একটি বড় বাধা। দেশের কয়লাক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, খনি থেকে কয়লা উঠাতে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রতিবন্ধকতাগুলো সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারি কি না, এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় কি না এবং সেখান থেকে আসলেই কয়লা উত্তোলন সম্ভব কি না এসব ব্যাপারে সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। যে কোম্পিানিগুলো প্রস্তাবনা দিয়েছে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করে দিচ্ছি। আমরা আলাদাভাবে আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিনি। আমি মনে করি এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। দেশে এখন বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হচ্ছে। যা দীর্ঘ ২৫ বছর মেয়াদে চলবে। এই কয়লা আমরা আমদানি করছি। অর্থাৎ কয়লা পোড়াতে আমাদের আপত্তি নেই কিন্তু কয়লা উত্তোলনে আপত্তি। এ জন্যই বলছি, আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিজস্ব উৎপাদন ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে হবে।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বলানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে খনিজসম্পদ যখন আছে তা ব্যবহার করাই উচিত। তবে এই কয়লা এমনভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করতে হবে যাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। এখানে ভূগর্ভস্থ খনি করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমতল ও উর্বর ভূমি অত্যন্ত ঘন। এখানে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য রিকভারি কম হলেও ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি কয়লা উত্তোলনে যেতে হবে। এভাবে যতটা কয়লা উত্তোলন করা যায় সেটি দেখতে হবে।
দেশের পাঁচ কয়লাক্ষেত্র : দেশের পাঁচটি কয়লা ক্ষেত্র ও খনিতে যে পরিমাণ কয়লা আছে তার ২০ শতাংশ উত্তোলন করা গেলে ১ হাজার ৫৬৪ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যেতে পারে। যা কিনা ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা পূরণ করবে। বর্তমানে একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করছে পেট্রোবাংলা। এ খনিতে এখনো ৩৯০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ লাখ টনের মতো কয়লা উত্তোলন করছে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে দেশের সবচেয়ে বেশি গভীরতার কয়লাক্ষেত্র অবস্থিত।
তথ্য উপাত্ত অনুসারে এই খনিতে ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টনের কয়লা মজুত আছে। যা ঘিরে নতুন সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী এই কয়লাক্ষেত্রে কয়লার মজুত আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টন। আগে এটি ছিল ১০০ কোটি টন। সমস্যা হচ্ছে জামালগঞ্জের কয়লা ভূগর্ভের প্রায় ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার গভীরে। এতে প্রচলিত পদ্ধতিতে খনি নির্মাণ করে কয়লা তুলতে উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন বা ইউসিজি পদ্ধতিতে কয়লা সরাসরি ওপরে না তুলে খনির ভিতরেই নিয়ন্ত্রিত উপায়ে তাকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। জামালগঞ্জের ইউসিজি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আছে বলে এক গবেষণায় ওঠে এসেছে। এ ছাড়া অন্য তিনটি কয়লা ক্ষেত্রের মধ্যে দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় আছে ৮৬৫ টন কয়লা। এটির উন্নয়নকাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সে সময় জার্মানির দুটি ও অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম খনি এলাকার সম্ভাব্যতা যাছাই করেছে। এর পরিপেক্ষিতে দীঘিপাড়া খনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত হয়। রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদে বেশ কিছুদিন আগে জানিয়েছেন যে, খালাশপীর কয়লাক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলনে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া ফুলবাড়ীতে মজুত আছে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা। এ খনি থেকে ৪৭২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। আর বছরে এই খনি থেকে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। অথচ দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি হয়। আর শুধু ফুলবাড়ীর কয়লা দিয়েই দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ৭৫ শতাংশ চাহিদা মেটানো যাবে।