Image description

সম্প্রতি নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের আবহে শেখ হাসিনা ও ভ্লাদিমির পুতিনের এক 'গোপন ফোনালাপ' নিয়ে নাকি 'বিশ্বজুড়ে তোলপাড়' শুরু হয়ে গেছে! আজ এমন খবর দিয়েছে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকা। 

তবে বাস্তবে 'বিশ্বজুড়ে তোলপাড়' এর এমন কোন খবর কোন নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে পাওয়া যায়নি।

এ সংক্রান্ত একটি গুজব পলাতক আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে পরিচিত কিছু ফেসবুক ও এক্স একাউন্টে গত দুইদিন ধরে দেখা গেছে। আওয়ামী এসব প্রোপাগান্ডা হ্যান্ডেলের বাইরে মানবজমিন অফিসে ‘তোলপাড়’ হয়ে থাকতে পারে বিষয়টি নিয়ে। এর বাইরে ভারতীয় কয়েকটি গোদি মিডিয়া ওয়েবসাইটে ‘সামাজিক মাধ্যমে সূত্রে জানা গেছে’ দাবি করে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বের কোন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে কোন খবর পরিবেশিত হয়নি।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী পন্থী একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে এই গুজবটি ছড়ানো হয়।  একইরকম গুজব এক বছর আগেও ছড়ানো হয়েছিল। পুরনো সেই গুজবটিকেই নতুন মোড়কে বাজারে ছাড়া হয়েছে।

আগের গল্পে অজিত দোভাল রাশিয়া গিয়ে ফোন ধরিয়ে দিয়েছিলেন পুতিনকে, আর শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনের কথা হয়েছিল ১৭ মিনিট। আর এবারের গল্পে দোভাল ভারতে বসেই শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনকে কথা বলিয়ে দিয়েছেন, আর আলাপের সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ মিনিটে!

আগের গুজবটিও কোন নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে নয়, বরং আওয়ামীপন্থী কিছু ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজে ছড়িয়েছিল।

মানবজমিন অফিসে ‘বিশ্ব তোলপাড়’ ও কয়েকটি ভারতীয় ওয়েবসাইট

দৈনিক মানবজমিন ১৬ সেপ্টেম্বর তাদের ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে “হাসিনার সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপ নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। 

ভিডিওতে বলা হয়, “নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিক সম্মেলনের আবহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে গোপন ফোন আলাপের গুঞ্জন ঘিরে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নানা প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক মহলের তথ্যমতে দিল্লিতে অবস্থানকালে রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় ২০ মিনিট ধরে ফোনে কথা বলেন শেখ হাসিনার সাথে।”

অজিত দোভালের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, “সবচেয়ে চমকপ্রদ দাবি হলো এই হাই প্রোফাইল ফোনালাপের সময় সেখানে নাকি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। পুতিন হাসিনা দোভালের এই ত্রিমুখী গুঞ্জন সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক টেবিলে তৈরি হয়েছে এক চরম নাটকীয়তা।”

শুধু ভিডিও নয়, ১৫ সেপ্টেম্বর “হাসিনার সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপ নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা” শিরোনামে মানবজমিন একটি সংবাদ প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। 

'নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা' বাইলাইনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “অনলাইনে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনের সময় প্রায় ২০ মিনিট হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন পুতিন। সেই সময় সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই ফোনালাপের খবর এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ভারত সরকার, রাশিয়া বা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতিও দেয়া হয়নি।”

মানবজমিন যে ‘অনলাইনে প্রকাশিত খবর’ এর কথা বলছে, তার সঙ্গে ভারতীয় কয়েকটি প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের মিল পাওয়া যায়। 

১৪ সেপ্টেম্বর ভারতীয় আরএসএস সমর্থিত পত্রিকা Organiser “After BRICS Summit: Putin, Hasina, Doval in focus” শিরোনামে ড. বিষ্ণু অরবিন্দের একটি প্রতিবেদন ছাপে। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়,  "According to the reports circulating online, Putin spoke to Sheikh Hasina for nearly 20 minutes during the BRICS Summit, with India’s National Security Advisor Ajit Doval reportedly present in the room during the conversation."

১৫ সেপ্টেম্বর Hindustan Times Bangla “Hasina-Putin Phone Call Speculation: ডোভালের উপস্থিতিতে পুতিন-হাসিনার কথা ফোনে? জল্পনার মাঝে রক্তচাপ বাড়ছে ঢাকার?” শিরোনামে অভিজিৎ চৌধুরীর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

সেই প্রতিবেদনেও মানবজমিনের প্রতিবেদনে থাকা তথ্যের সাথে মিল ছিল।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রচারিত দাবি অনুযায়ী, ব্রিকস সম্মেলনের সময় প্রায় ২০ মিনিট হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন পুতিন। সেই সময় ঘরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।”

ভারতীয় প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট এবং মানবজমিনের এই সংবাদ প্রকাশের পর একই বিষয়ে কথা বলেন আওয়ামী পন্থী সাংবাদিক নবনিতা চৌধুরী। 

১৫ সেপ্টেম্বর তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে “দিল্লিতে হাসিনাকে পুতিনের ফোন?।। Nobonita Chowdhury” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। 

সেখানে তিনি এই অসমর্থিত দাবিকে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে রূপ দিয়ে বলেন, “অর্গানাইজার পত্রিকা সরাসরি লিখছে যে ওই ২০ মিনিটের ফোনালাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শেখ হাসিনার প্রতি বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। তার মানে রাশিয়া আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে সেটা খোদ পুতিন শেখ হাসিনাকে কথা দিয়েছেন এবং নিশ্চিতভাবেই শেখ হাসিনার বাংলাদেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও পুতিনের সম্পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। পুতিন শুধুমাত্র শেখ হাসিনাকে ব্যক্ত করেছেন তাই নয়, এই ব্যক্ত করার ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সামনে।”

নবনীতা ছাড়াও আওয়ামী পন্থী অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে হাসিনা-পুতিনের ২০ মিনিটের ফোনালাপের দাবিতে পোস্ট করা হয়েছে।

দেখুন এখানেএখানে ও এখানে

সবার সূত্র সামাজিক মাধ্যম

এখন প্রশ্ন হলো, মানবজমিন, অর্গানাইজার, হিন্দুস্তান টাইমস আর নবনিতা চৌধুরীর এই '২০ মিনিট' আর 'অজিত দোভালের উপস্থিতির তথ্যের মূল উৎস কোথায়?

এসব ওয়েবসাইটে আলোচ্য খবরটির কোন সুনির্দিষ্ট সূত্র দেয়া হয়নি। বরং সামাজিক মাধ্যমের গুঞ্জনকেই ‘সূত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভিডিওতে সূত্র হিসেবে দৈনিক মানবজমিন বলেছে, “অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নানা প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক মহলের তথ্যমতে”। 

আবার তাদের অনলাইন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দিল্লির একটি সাংবাদিক সূত্র এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত না করলেও জানিয়েছে, বিষয়টি অসম্ভব নয়” এবং “অনলাইনে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়েছে”। 

অন্যদিকে ভারতীয় পোর্টালগুলোতেও একই রকম সূত্রের উল্লেখ করেছে। 

আরএসএস সমর্থিত ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, "According to the reports circulating online" এবং "Reports circulating on social media and in diplomatic circles"। 

হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, “সমাজমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মহলে ছড়িয়েছে আরও একটি দাবি” এবং “প্রচারিত দাবি অনুযায়ী”।

প্রাসঙ্গিক কীওয়ার্ড সার্চ করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক্স এ করা একটি পোস্টের সন্ধান পাওয়া যায়। 

‘tofani’ নামের একটি আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ওই পোস্টে বলা হয়, “Confidential diplomatic sources claim Vladimir Putin spoke with Sheikh Hasina for nearly 20 minutes during the BRICS summit in India — and that India’s NSA Ajit Doval was in the room.. The money trail is not rumor. Under Hasina, Bangladesh built Rooppur with Rosatom about $12 billion.”

ওই পোস্টের ‘২০ মিনিট’, ‘অজিত দোভাল’ এবং ‘রূপপুরের ১২ বিলিয়ন ডলার’ এই তিনটি কীওয়ার্ড পরবর্তী প্রতিবেদন ও ভিডিওগুলোতেও দেখা যায়।

tofani এর ওই পোস্টেই তথ্যগুলোকে অযাচাইকৃত বা আনভেরিফাইড বলেে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা না থাকার কথা উল্লেখ করে ওই পোস্টে লেখা হয়, "No transcript. No readout. No confirmation from Moscow, Delhi, or Hasina’s circle. Treat it as a claim until it is proven." 

পোস্টের একেবারে শেষে 'Unverified' শব্দটি ব্যবহার করে লেখা হয়: "Unverified. High-stakes. Impossible to ignore."

এভাবেই একটি প্রোপাগান্ডামূলক এক্স একাউন্টের দেয়া “অযাচাইকৃত” তথ্য মানবজমিন, অর্গানাইজার, হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা ও আওয়ামীপন্থী ইউটিউব চ্যানেলে ‘বিশ্বজুড়ে তোলপাড়’ এর গল্পে পরিণত হলো।

উল্লেখ্য, পুতিন-হাসিনার সাথে ফোনালাপের কাহিনি একেবারেই নতুন নয়। 

২০২৫ সালের ১০ আগস্ট 'National Dialogues' নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে “পুতিন হঠাৎ কেন ফোন করলেন হাসিনাকে? আসলে ভারত, চিন ও রাশিয়া বাংলাদেশকে নিয়ে অক্ষ গঠনের পথে” টাইটেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। 

ওই ভিডিওতে সঞ্চালক তরুণ ঘোষ দাবি করেন, “পুতিন নিজে উদ্যোগী হয়ে পুতিন ফোন করেছিলেন শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনার সঙ্গে যে কথাবার্তা হয়েছে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি ততটুকু আপনাদের বলেছি”

একই বছর ভারতীয় 'newsbartaman.com' নামের একটি অনলাইনে “ডোভালের মাধ্যমে হাসিনা পুতিন ফোনালাপ অপেক্ষা চিনে গিয়ে কি করেন প্রধানমন্ত্রী” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। 

ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, “ভারতের এনএসএ অজিত ডোভাল রাশিয়ায় আছেন এবং তিনি রাশিয়া থেকেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ফোনে কথা বলিয়ে দেন। এবং জানা যাচ্ছে পুতিনের সঙ্গে হাসিনার প্রায় সতেরো মিনিটের মত কথা হয়েছে।”