গ্রামীণফোনে ১৪ বছর আগে চাকরিচ্যুতদের নিয়ে গ্যাঁড়াকলে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেকের বেশি শেয়ারধারী নরওয়ের বহুজাতিক টেলিকম জায়ান্ট টেলিনর এএসএ। দেশটির আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও মানবাধিকার মানদণ্ড তদারককারী সংস্থা ন্যাশনাল কন্টাক্ট পয়েন্ট (এনসিপি), নরওয়ে টেলিনরকে দ্রুত মধ্যস্থতার টেবিলে বসার আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দিয়েছে। এনসিপি কোনো আদালত না হলেও, এই নির্দেশনায় সুনাম রক্ষার চাপে পড়েছে টেলিনর।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রামীণফোনের ৫৫.৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক টেলিনরের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ বিষয়ে ‘ওইসিডি নির্দেশিকা’ লঙ্ঘনের অভিযোগ দিয়েছিলেন চাকরিচ্যুত কর্মী ও ইউনিয়ন নেতারা। কয়েক মাস আগে বিষয়টি নিয়ে নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে বসে এনসিপি। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে উভয়পক্ষকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে মধ্যস্থতার টেবিলে বসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে।
গ্রামীণফোনের চাকরিচ্যুত কর্মীরা জানান, ঘটনার সূত্রপাত ২০১২ সালের ২৩ জুলাই। ওই দিন গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (জিপিইইউ) নেতারা সরকারি দপ্তরে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন জমা দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া ২০০ জনের বেশি কর্মীকে ছাঁটাইয়ের চিঠি দেয় দেশের শীর্ষ টেলিকম প্রতিষ্ঠানটি। এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন জিপিইইউয়ের সভাপতি, সহসভাপতি, যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরীসহ তৎকালীন কার্যনির্বাহী কমিটির সাত শীর্ষ নেতা।
বাংলাদেশের শ্রম আইনের ১৮৬ ধারা অনুযায়ী, ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরির শর্ত পরিবর্তন বা ছাঁটাই সম্পূর্ণ বেআইনি। অভিযোগকারীদের দাবি, গ্রামীণফোন ওই সময় প্রতিষ্ঠানের আইন ভেঙে বেছে বেছে জ্যেষ্ঠ ও ইউনিয়নপন্থী কর্মীদের ছাঁটাই করে অথবা পদত্যাগে চাপ দেয়। একই ধরনের বলপ্রয়োগের পুনরাবৃত্তি ২০১৫ ও ২০২১ সালেও ঘটেছে।
আইনি মারপ্যাঁচে ১৪ বছর
ওই ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে মামলা করেন আদিবা জেরিন চৌধুরীসহ ২২ কর্মী। কিন্তু শুনানি পেছানো, উচ্চ আদালতে এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ ও স্থগিতাদেশের কারণে এখনও বিচার ঝুলে আছে।
অভিযোগকারীরা জানান, ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট মামলাগুলো ফের শ্রম আদালতে পাঠিয়েছে। তাদের আশঙ্কা— স্থানীয় আদালতে এটি নিষ্পত্তি হতে আরও এক-দুই দশক লাগবে।
এর মধ্যে ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের (আইটিইউসি) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দ্বারস্থ হন আদিবা জেরিন। ২০২৪ সালে আইএলও বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ধীরগতির সমালোচনা করে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদও দেয়।
এরপরও আইনি প্রক্রিয়া না এগোনোয় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদিবা জেরিন ২০ সহকর্মীর পক্ষে নরওয়ের এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেন। এর সঙ্গে গ্রামীণফোনের প্রায় ৪ হাজার কর্মীর ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) বকেয়া লভ্যাংশ ও সুদের জটিলতার বিষয়টিও যুক্ত করেন।
টেলিনরের আত্মপক্ষ সমর্থন
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ ও ২৯ মে এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয় টেলিনর। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। ২০১২ সালের ছাঁটাই ইউনিয়ন গঠনের প্রতিক্রিয়ায় নয়, বরং বছরের শুরু থেকে পরিকল্পিত ‘ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের’ অংশ ছিল। কর্মীদের ১০ জুলাইয়ের আগেই বিষয়টি জানানো হয়েছিল। আর ইউনিয়নের আবেদন জমা পড়ে ২৩ জুলাই।
টেলিনরের যুক্তি, তারা একটি হোল্ডিং কোম্পানি এবং সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল স্থানীয় ব্যবস্থাপনা। টেলিনর তা চাপিয়ে দেয়নি। বিচারিক বিলম্ব নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশের আদালতই এই বিরোধ নিষ্পত্তির সঠিক জায়গা।
যা জানাল গ্রামীণফোন
এনসিপির নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোন স্ট্রিমকে একটি লিখিত বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করা, কোনো ভুল বা অন্যায় প্রমাণ করা নয়। এনসিপি এখনও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেও আসেনি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ডব্লিউপিপিএফের সুদ পরিশোধ না করার অভিযোগটি অধিকতর বিবেচনার যোগ্য নয় বলে অভিমত দিয়েছে এনসিপি। বাংলাদেশে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এর সমাধান হওয়া উচিত বলে জানিয়েছে তারা।
এনসিপির পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
উভয়পক্ষের শত শত পাতার নথিপত্র ঘেঁটে এনসিপি তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, বাংলাদেশ ওইসিডি নির্দেশিকায় সই করা দেশ না হলেও, অভিভাবক প্রতিষ্ঠান টেলিনরের ভৌগোলিক অবস্থান নরওয়েতে হওয়ায় আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা পর্যালোচনা করার পূর্ণ এখতিয়ার এনসিপির রয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার থাকলেও, বাস্তবে তা প্রয়োগের পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদের ১০ জনের মধ্যে চেয়ারম্যানসহ ৫ জনই টেলিনরের মনোনীত। ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অভিভাবক প্রতিষ্ঠানের অপরিসীম প্রভাব রয়েছে। টেলিনর সেই প্রভাব খাটিয়ে মানবাধিকার ও শ্রম মানদণ্ড রক্ষায় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ডব্লিউপিপিএফের সুদের বিষয়টি বাংলাদেশ শ্রম আইনের সরাসরি আওতাধীন হওয়ায় তা পর্যালোচনায় নেওয়া হয়নি। তবে ২০১২ সালে হঠাৎ ছাঁটাই, ইউনিয়ন ধ্বংসের চেষ্টা এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় কর্মীদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে মূল অভিযোগকারী আদিবা জেরিন স্ট্রিমকে বলেন, এনসিপির এই মূল্যায়ন ঐতিহাসিক অগ্রগতি। ২০১২ সালের ইউনিয়নবিরোধী বরখাস্তের ঘটনায় ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকারের জন্য আমরা ১৪ বছর চেষ্টা করছি। ২০২৪ ও ২০২৬ সালে আইএলও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর প্রতিকারের সুপারিশ করলেও এখনও তা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অভিযোগ শুধু ২০১২ সালের বরখাস্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামীণফোনে দীর্ঘদিনের শ্রমবিরোধ, শ্রমিক অধিকার ও অনিয়মের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আমরা তুলে ধরেছি, যার মধ্যে ২০২১ সালে ১৫৯ কর্মী ছাঁটাই এবং ৪ হাজার শ্রমিকের ডব্লিউপিপিএফের ১৬ বছরের বকেয়া পাওনা নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থার বিষয়ও ছিল। এনসিপি ২০১২ সালের অভিযোগটি পর্যালোচনার আওতায় নিয়েছে এবং অন্য দুটি বিষয়কে এখতিয়ারের বাইরে বলে উল্লেখ করেছে। তবে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলেনি।
এনসিপির প্রতিক্রিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জবাবদিহিতা ও প্রতিকারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন জানিয়ে আদিবা জেরিন বলেন, আমরা আশা করি, টেলিনর যথাযথ সতর্কতা ও দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে ১৪ বছর ধরে বঞ্চিত কর্মীদের জন্য একটি অর্থবহ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিকারের পথ তৈরি করবে। পাশাপাশি গ্রামীণফোন ম্যানেজমেন্ট এনসিপির এখতিয়ারের বাইরে থাকা অন্যান্য শ্রমবিরোধ ও পাওনা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিজেদের উদ্যোগে নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, এনসিপির এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত রায় না হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু আইনি বিরোধ নয়, বরং আইনগত বৈধতা ও করপোরেট দায়িত্বশীলতার ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা।