মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, দেশের বিদ্যমান অর্থনীতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জনগণের দুর্ভোগ বিবেচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজতে রাতদিন কাজ করছে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল। এজন্য নানামুখী বৈঠক ও পর্যালোচনা অব্যাহত আছে। কীভাবে দেশে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চিন্তা করছে জ্বালানি বিভাগ। পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মনিটরিং করছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে বিদ্যমান সংকটের অন্যতম কারণ চারটি। এগুলো হলো : দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ খাত এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি ও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়া। তবে সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বড় দায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের। যারা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পুরোপুরি ডুবিয়ে দিয়েছে। লোডশেডিং কমিয়ে উৎপাদন বাড়ালেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরকে একেবারে বিদেশনির্ভর করে ফেলে। এছাড়া পছন্দের লোকজনকে কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর অনুমতি দিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠানকে এই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে দেশ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হতে বসেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরকে পুঁজি করে ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীত করা হয়। যার ভয়াবহ ক্ষত এখন বেরিয়ে আসছে। আর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। এ সংকট মোকাবিলা করতে বিএনপি সরকারকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন এবং ৩টি এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে দেশে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। এতে এ সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করতে চায় সরকার। বর্তমান গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এ হিসাবে ৪ বছরে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে দ্বিগুণ। একই সঙ্গে কয়লার উৎপাদন বাড়াতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে বলেন, বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা হবে। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনগণের যে ভোগান্তি হচ্ছে, সে ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণ সচেতন। তবে এ সংকট বর্তমান সরকারের তৈরি নয়। এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুলনীতি ও অনিয়মের ফসল। তিনি বলেন, এ সমস্যা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিছু বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, জ্বালানি ছাড়াও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের উন্নয়নে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সাধারণ উদ্যোক্তা তৈরি করতে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ কেনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নেট মিটারিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব আসতে পারে। এছাড়া তিন বছরের মধ্যে পায়রা, বড়পুকুরিয়া ও মাতারবাড়ীতে কমপক্ষে তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বসিয়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতের ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী। বিশেষ করে কোনোরকম যাচাই-বাছাই না করে বিশেষ আইনে (২০১০) বেসরকারি খাতে যেখানে-সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো আউটপুট পাচ্ছে না। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সোমবার যুগান্তরকে বলেছেন, জ্বালানি খাতের ক্রমাগত চাহিদা পূরণে সরকার সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাইমারি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার জ্বালানি সরবরাহে স্থানীয় উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি আমদানিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে একটি টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে আরও কমপক্ষে দুটি এফএসআরইউ স্থাপন ও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সমুদ্রে ব্লক বরাদ্দে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেই দরপত্রের শেষ তারিখ আগামী নভেম্বরে। এর বাইরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে শিগ্গিরই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে।
মূল চ্যালেঞ্জ প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো : প্রাথমিক জ্বালানি অর্থাৎ তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই প্রাইমারি ফুয়েল বা প্রাথমিক জ্বালানি ছাড়া দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কলকারখানা, রান্না ও পরিবহণসহ কোনো খাতই চলবে না। কিন্তু এ খাতই এতদিন বড় সংকটে আটকে আছে।
গ্যাসের ব্যাপারে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এ মুহূর্তে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অথচ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুটের মতো। আবার এই ২৬০ কোটির মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি (স্বাভাবিক সময়ে) গ্যাস আমদানি করে গ্রিডে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে ৭০ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানিতে চাহিদা পূরণ করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কয়লার চাহিদা পূরণ। দেশে বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে কিছুটা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ৬ হাজার মোগাওয়াট। সেই কেন্দ্রে বছরে দেড় কোটি টন কয়লা ব্যবহার হয়। যার শতভাগ আমদানি হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া থেকে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সপ্তাহে সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে ১০ বছরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বলা হয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ (২৮ ফেব্রুয়ারি) শুরু হয়। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত (কয়লা ছাড়া) মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে এখন সরবরাহ এবং ক্রয়মূল্যে বড় ধরনের খেসারত দিতে হচ্ছে সরকারকে। এর বাইরে আওয়ামী সরকারের আমলে সমুদ্র ও ভূমিতে কোনো কূপ খনন করা হয়নি। বিশেষ করে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার মীমাংসা হওয়ার পরও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খননের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়নি। এমনকি কোরিয়ার ডাইয়ু কোম্পানি সমুদ্রে গ্যাস পাওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে কূপ খননের জন্য তারা সরকারকে কিছু শর্ত দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সেই শর্ত মানেনি।
এদিকে গত সাত মাসে সরকারকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল নিয়ে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাসের সংকট ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে এ পর্যন্ত সরকারের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম সোমবার আরও এক দফা বেড়ে ব্র্যান্ড ক্রুডের দাম ১০৭ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। সুতরাং তেল কিনে সরকারের এই লোকসান আরও বাড়বে। এছাড়া বেশি দামে এলএনজি কিনে কম দামে বিক্রির কারণে এ পর্যন্ত সরকার এই খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
দেশকে এগিয়ে নিতে সবার আগে জ্বালানি খাতে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে ১৫০টি কূপ খনন করে ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হবে। আগামী ১০ বছরে আরও ৪/৫টি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা আছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ বসিয়ে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। এছাড়া মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড বেইজড টার্মিনাল বসিয়ে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হবে জাতীয় গ্রিডে। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে দৈনিক ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে তেলের মজুত ৯০ দিনে উন্নীত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তেলের মজুত আছে ৩২ দিনের। আগে এই মজুত ছিল মাত্র ১৭ দিনের। এছাড়া ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ বসানোর জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-আইডিবির সঙ্গে ইতোমধ্যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। এর বাইরে ভর্তুকি মূল্যে গরিব পরিবারকে প্রতি মাসে এলপিজি দিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য বিপিসিকে প্রতি মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানি করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিপিসি ইতোমধ্যে মহেশখালী, কাট্টলী, মাতারবাড়ী, মোংলা এবং অ্যালেঙ্গায় এলপিজির ডিপো করতে উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের হালচাল : গরম বাড়ার কারণে এবার বিদ্যুতের চাহিদা বেশ বেড়েছে। এছাড়া গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক কেন্দ্র ঠিকমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। পিডিবি অভিযোগ করেছে বিদ্যুৎ খাতে ২০২২ সালে যেখানে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো, সেখানে এখন দেওয়া হচ্ছে ৮৭ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং হওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে পিডিবি জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করেনি। এই খাত ভর্তুকিনির্ভর করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। এ কারণে বর্তমান অর্থবছরে সরকার এ পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতে ৩২ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞের অভিমত : ইনডিপেনডেন্ট ইউনির্ভাসিটির উপাচার্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম যুগান্তরকে বলেছেন, সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সোলার প্যানেল বসানোর ক্ষেত্রে সরকার শুধু ঘোষণা দিলেই চলবে না। এর জন্য একটি বড় কর্মসূচি নিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি তেল, গ্যাস এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর পরিকল্পনা থাকতে হবে। তিনি বলেন, সবার আগে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চত করতে হবে। বিশেষ করে এর উৎস। সেই হিসাবে জ্বালানি ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি গোছানো পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হতে পারে। তিনি বলেন, কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ আমরা কতটুকু করব এবং সেই কয়লা কোত্থেকে আসবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে আর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হবে কি না, তা নিয়ে পর্যালোচনা করা যায়। তিনি বলেন, বেশি করে এফএসআরইউ বসালে একসময় গলার কাঁটা হতে পারে। এখন জ্বালানি বিল ১২/১৩ বিলিয়ন ডলার দিতে হচ্ছে। এই বিল অনেক বাড়বে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এই ব্যয়ভার বহন করতে পারবে।
এদিকে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেছেন, সরকারকে সবার আগে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে হাত দিতে হবে। যে কোনোভাবে ২/৩ বছরে পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো সৌরবিদ্যুতের ব্যাবহার বাড়াতে হবে। এজন্য প্যানেল এবং ব্যাটারির ওপর সব শুল্ক তুলে দিতে হবে। সরকারকে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারের পরিকল্পনা : বিদ্যুৎ খাতে আপাতত ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য সবার আগে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে চায় সরকার। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে ইতোমধ্যে কৌশলপত্র ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য মার্চেন্ট পাওয়ারের আওতায় বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যাতে যে কেউ ব্যাটারিসহ সোলার প্যানেল বসিয়ে সরকারের বিতরণ কোম্পানির কাছে সাড়ে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারবে। এই প্যাকেজে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে চাইছে সরকার। এ সুবিধা নেওয়া যাবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং এর মেয়াদ থাকবে তিন বছর। এছাড়া পায়রা, মাতারবাড়ী এবং বড়পুকুরিয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তিনটি কেন্দ্র বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে জমি প্রস্তুত আছে। এখন কোন পদ্ধতিতে এই কেন্দ্র বসানো হবে, সেই পরিকল্পনা হচ্ছে। এছাড়া এবার লোডশেডিং কাটাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে সরকার গ্রিড লাইনের ক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বলে পিডিবি দাবি করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সৌরবিদ্যুতের ৩৭টি প্রকল্পের সম্মতিপত্র (এলওআই) বাতিল করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।