Image description

যে বয়সে হাতে বই-খাতা আর খেলনা উপকরণ থাকার কথা, সেই বয়সে তাদের হাতে উঠছে কোদাল আর জাল। চরাঞ্চলের নদীভাঙন আর বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা শিশুর শৈশব নদীগর্ভেই হারিয়ে যাচ্ছে। টেকসই পরিকল্পনা ও চরভিত্তিক বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার উদ্যোগ না নেওয়ায় কুড়িগ্রামের নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলে বেড়ে ওঠা কয়েক লাখ শিশুর কাছে শিক্ষা আজও এক অধরা বাস্তবতা। এ জেলায় ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ ১৬টি নদনদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা শতাধিক চরাঞ্চলে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। অথচ এ চরাঞ্চলের ২৫০টি চরে নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে শিক্ষার আলো ছাড়াই অনাদর, অবহেলা আর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিন লাখের মতো শিশু বেড়ে উঠছে। তাদের অনেকের কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া কেবল অলীক স্বপ্ন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে।

সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের এসব চরের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কৃষিকাজ ও মাছ ধরা। চরের নদীভাঙনকবলিত ও হতদরিদ্র পরিবারগুলোর ছোট-বড় সবাই টিকে থাকার লড়াইয়ে এসব পেশায় যুক্ত হয়। মা-বাবার সঙ্গে প্রতিদিনের গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়া চরাঞ্চলের শিশুদের শৈশব বন্দি হয়ে পড়ছে কাজের চক্রে। সেখানে খেলাধুলা বা বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, নেই স্কুলে যাওয়ার স্মৃতিটুকুও। প্রতিনিয়তই টিকে থাকতে হয় প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার খেলায়। কখনো নদীভাঙনে বাস্তুভিটা হারিয়ে বাঁধে আশ্রিত জীবন; কখনোবা বর্ষা মৌসুমে বন্যাকবলিত নদীতে ভাসমান জীবন।

সরকারি হিসাবে কুড়িগ্রামে ১ হাজার ২৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার মধ্যে চরাঞ্চলে রয়েছে ১৬৯টি। চার শতাধিক চরের বিপরীতে এই অল্পসংখ্যক বিদ্যালয় চরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার চাহিদা পূরণে একেবারেই অপ্রতুল। উলিপুর ও সদর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। ব্রহ্মপুত্রের বুকজুড়ে জেগে ওঠা কালির আলগা চরে চার শতাধিক হতদরিদ্র পরিবারের বসবাস হলেও সেখানে কোনো বিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। একই পরিস্থিতি দেখা যায় ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার বালাডোবা, মুসারচর, আটাশির চর, মাফিয়ালির চর, মসলার চরসহ ধরলা, তিস্তা ও দুধকমুার অববাহিকার বেশির ভাগ চরাঞ্চলেও।

সদর উপজেলার কালির আলগা চরের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সি রফিকুল আলম আফসোস করে জানান, পাঁচ বছর আগে এই চরটি জেগে উঠলে সেখানে ৫০০ পরিবার বাস শুরু করে। তবে এতদিনেও কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় এ চরের শিশুরা শিক্ষার আলো ছাড়াই শ্রমিকের জীবনে প্রবেশে বাধ্য হচ্ছে।

উলিপুর উপজেলার মুসার চরের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সি আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চরে দেড় শতাধিক পরিবারে দেড় শতাধিক শিশু রয়েছে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হলে অন্তত শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেত।’

পার্শ্ববর্তী চরে বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কোমলমতি শিশুদের ছোট ছোট ডিঙি বা মাছ ধরার নৌকায় ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়। জীবনের ঝুঁকি থাকায় অনেক অভিভাবকই সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে সাহস পান না। আট-দশ বছর আগে কিছু এনজিও চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগ নিলেও আর্থিক সংকটের কারণে বর্তমানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিকল্প কোনো শিক্ষার পথও চরের শিশুর সামনে খোলা নেই।

শিক্ষার অভাব ও যাযাবর জীবন চরের শিশুর ভবিষ্যৎ আরও বেশি অন্ধকার করে তুলছে। ৬৬ বছর বয়সি জয়নব বিবি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, চরের ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কোনো শৈশব স্মৃতি নেই। এতে চরাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার বেশি। শিশু বয়সেই এক প্রজন্ম নতুন আরেক শিশুর জন্ম দিয়ে মা হওয়ার বোঝা বইছে-যে চক্র বংশানুক্রমে অব্যাহত রয়েছে।

জানা যায়, প্রতিবছর নদীভাঙন ও বন্যার কারণে কুড়িগ্রামে চার থেকে পাঁচ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। চরের মানুষ আজ এক চরে তো কাল অন্য চরে যাযাবরের মতো দিন কাটায়। এই অনিশ্চিত জনবসতিকে কারণ দেখিয়ে চরাঞ্চলে নতুন কোনো বিদ্যালয় স্থাপনে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কুড়িগ্রাম জেলার বাসিন্দা অধ্যাপক ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন, শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে নিতে না পারলে সরকারের যে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য, তা ভেস্তে যাবে। এজন্য সরকারের চরাঞ্চলের শিক্ষা কাঠামোর জন্য ভিন্নমাত্রায় অবকাঠামো ও কার্যক্রম তৈরি করতে হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী ও পরিবেশ সংগঠক ড. তুহিদ ওয়াদুদ চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার এই দশা নিয়ে বলেন, সরকার সমতল ভূমিতে যে পদ্ধতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো তৈরি করে, তা থেকে ভিন্নতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো করতে হবে। যা বন্যা ও নদীভাঙনসহিষ্ণু হতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়তের জন্য বিশেষ নৌপরিবহণ থাকতে হবে। চরাঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা চালু করতে হবে। তা না হলে চরের এই বিশাল জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলো থেকে চিরকাল বঞ্চিত থাকবে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় বলেন, নদীভাঙনের কারণে জেলার চরাঞ্চলগুলো অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তারা ছাড়া চরগুলোর স্থায়িত্ব নেই। এছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারেরও তেমন কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। তবে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বিষয়টি বারবার জানিয়ে আসছি। যদি সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমরা সেভাবে কাজ শুরু করব।