দেশের সব সিটি করপোরেশনে জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা কমানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি অফিস আদেশে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরি বিধিমালা সংশোধন করা হয়নি। সাধারণ অফিস আদেশের মাধ্যমে গেজেটভুক্ত বিধিমালার ক্ষমতা সংকুচিত করার এই আদেশের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ১২ আগস্ট অফিস আদেশটি জারি করে। এতে সিটি করপোরেশনগুলোর ৭ম থেকে ২০তম গ্রেডের পদে জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য দুটি বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ম থেকে ১০ম গ্রেডের জন্য গঠন করা হয়েছে ‘বাছাই কমিটি-১’। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক এ কমিটির আহ্বায়ক। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সদস্য হিসাবে থাকবেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও কমিটিতে থাকবেন। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের সচিব হবেন সদস্য সচিব।
এছাড়া ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য গঠন করা হয়েছে ‘বাছাই কমিটি-২’। এর আহ্বায়ক সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এ কমিটিতেও স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ গ্রেডের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এর একটি পরিপত্র অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই পরিপত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সেসব পদ শুধু কেন্দ্রীয় কমিটির আওতায় আসবে, যেসব পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন বা নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরকারের। যদিও সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালায় ভিন্ন বিধান রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা, ২০১৯ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসাবে করপোরেশনকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, সরাসরি নিয়োগের জন্য করপোরেশন বাছাই কমিটি গঠন করবে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও করপোরেশন গঠিত বাছাই বা নির্বাচন কমিটির সুপারিশ প্রয়োজন হবে।
ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডের পদে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী এসব পদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সরকার নয়। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলো করপোরেশন।
ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা ২০১৯ সালের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশনেরও পৃথক চাকরি বিধিমালা রয়েছে। গাজীপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালারও গেজেটও প্রকাশ করা হয়েছে।
এসব বিধিমালা স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর ক্ষমতাবলে প্রণীত। এগুলো বিধিবদ্ধ দলিল। তাই সাধারণ অফিস আদেশ দিয়ে বিধিমালার কোনো বিধান পরিবর্তন বা অকার্যকর করার সুযোগ নেই। পরিবর্তন করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ায় বিধিমালা সংশোধন করতে হবে। সংশোধনী সরকারি গেজেটেও প্রকাশ করতে হবে।
সিটি করপোরেশন আইনের ১০৫ ধারায় সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই নির্দেশ বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রশাসনিক নির্দেশ ও গেজেটভুক্ত বিধিমালার মধ্যে বিরোধ হলে বিধিমালাই প্রাধান্য পাওয়ার কথা।
নতুন অফিস আদেশে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন’র কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো আইন বা বিধির সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাবলে বিদ্যমান বাছাই কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে, তা আদেশে উল্লেখ করা হয়নি। আদেশটি কার্যকর হলে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সিটি করপোরেশনগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমবে। প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। এতে নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা তৈরিরও আশঙ্কা রয়েছে।
সব সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা এক নয়। তাই আদেশটির আইনি প্রভাবও সব করপোরেশনের ক্ষেত্রে সমান হবে না। তবে আদেশটি দেশের সব সিটি করপোরেশনের জন্য জারি করা হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষমতা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
আইনগতভাবে আদেশটি গেজেটভুক্ত চাকরি বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কমিটি বাধ্যতামূলক করার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট নয়। তবে আদালত আদেশটি বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা না করা পর্যন্ত একে সরাসরি বেআইনি বলা যাবে না। আদেশটির আইনগত বৈধতা যাচাই এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট চাকরি বিধিমালা সংশোধন করা দরকার।
এ প্রসঙ্গে নগর উন্নয়ন-১ অধিশাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো নগর সংস্থার কথা থাকলে তাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে।