দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনসহ ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই আসবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে। প্রকল্পের নথিতে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হলেও ব্যাংকের এসব দুর্বলতা কাটাতে ব্যয় হচ্ছে ঋণের ক্ষুদ্র একটি অংশ। জানা গেছে, প্রকল্পের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করা হবে তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, সফটওয়্যার ও পরামর্শক খাতে। আইসিটি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার কিনতেই ব্যয় করা হবে ১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের নাম ‘আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২’। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকল্পের নথিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা হিসাবে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, মূলধন ও তারল্য সংকটের কথা বলা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজল্যুশন এবং আর্থিক খাতের সুরক্ষা বাড়ানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু এসব সংকটের বিপরীতে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোতে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রযুক্তি খাতে কেনাকাটায়। আইসিটি সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে লাগবে আরও ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা। ডেটাবেজ তৈরিতে ব্যয় করা হবে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু এই তিন খাতেই ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।
এর সঙ্গে কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রসহ অন্যান্য মূলধনি ব্যয় যোগ করলে মূলধন খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্পে মূলধন ব্যয়ের বড় অংশই প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহকেন্দ্রিক। প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংকিং খাতের যে সংকটকে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তি হিসাবে দেখানো হয়েছে, সেই সংকট মোকাবিলায় ঋণের অর্থের এত বড় অংশ প্রযুক্তি কেনাকাটায় ব্যয় করার প্রয়োজনীয়তা কতটা?
কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং সেবা এখন আইটি নির্ভর। এখন তো আর অ্যানালগে কোনো সেবা চলে না-তাই আইটি খাতে বরাদ্দটা বেশি। এই খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে তথ্যপ্রযুক্তিতে জোর দেওয়াটাও জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যাহত হবে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শতভাগ আইটি নির্ভরতা নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংকে যে খেলাপি হয়-এর কারণ নীতিমালা অনুসরণ না করে ঋণ দেওয়া। কোনো ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে না। তবে নীতিমালা যেন অনুসরণ করে সেটা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নীরিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, পরামর্শক নিয়োগেও যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। ব্যক্তি পরামর্শকের জন্য বরাদ্দ ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য আরও ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। দুই ধরনের পরামর্শক মিলিয়ে ব্যয় হবে ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৫৩ জনমাস এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ছয়টি চুক্তির সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রশিক্ষণেও কম যাচ্ছে না। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দিতে বরাদ্দ ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা আসবে প্রকল্পের ঋণ থেকে। অর্থাৎ বিদেশি ঋণের অর্থ দিয়েই প্রশিক্ষণের বড় অংশের ব্যয় মেটানো হবে। প্রকল্পের রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শকের পাশাপাশি সেমিনার ও সম্মেলন, যানবাহন ব্যবহার, ইন্টারনেট, কম্পিউটার সামগ্রী, মুদ্রণ, স্টেশনারি ও মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় হবে।
সমস্যার তালিকা বড়, সমাধানে প্রযুক্তির ওপর জোর : প্রকল্পের নথিতে দেশের আর্থিক খাতের সংকটের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা আর্থিক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু সরকারি ও ইসলামী ব্যাংক তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। পাশাপাশি পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর কারণে সাইবার হামলা এবং সীমান্তপারের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্বলতা রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারেও সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো বলছে, বাস্তব সংস্কারের চেয়ে সংস্কারের জন্য প্রযুক্তি ও সক্ষমতা তৈরিতে অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে। ফলে প্রকল্প শেষে কী ধরনের দৃশ্যমান সংস্কার হবে এবং সেই সংস্কারের বিপরীতে ঋণের অর্থের ফলন কতটা পাওয়া যাবে-সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগের প্রকল্পের সরঞ্জামও যাচাই হবে : নতুন প্রকল্পের আগে আগের আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প থেকে কেনা যন্ত্রপাতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় আগের প্রকল্পের কিছু যন্ত্রপাতি ও উপকরণ নতুন প্রকল্পে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। তবে যেসব যন্ত্রপাতি অচল বা ব্যবহারের অনুপযোগী, সেগুলো নেওয়া যাবে না।
এ জন্য আগের প্রকল্প থেকে কোন কোন সরঞ্জাম স্থানান্তর করা হবে, তার তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। এই নির্দেশের মধ্য দিয়ে নতুন প্রকল্পে নতুন করে সরঞ্জাম কেনার আগে আগের প্রকল্পের সম্পদ কতটা ব্যবহারযোগ্য, সেটি যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়েছে।
সফটওয়্যার কেনায় বিপুল বরাদ্দ, প্রশিক্ষণ খাতে এত কম কেন-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশ প্রশিক্ষণ এড়িয়ে যেতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে। আমরা বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ দেশেই দিয়ে থাকি। যদি কোনো প্রশিক্ষণ বিদেশে প্রয়োজন হয় তখন আমরা সেটা বিবেচনা করি। তাই এ খাতে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে। তবে দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেটার ব্যয় বৃদ্ধির চেষ্টা করব।