Image description

ব্যক্তির চরিত্র হনন, গালাগাল করা, ছবি বা বক্তব্য বিকৃত করাসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে সাইবার স্পেসে। এ ছাড়া বিনা অনুমতিতে কারো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে (কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, পিসি ইত্যাদি) ঢুকে পড়া, সত্যকে বিকৃত করে মিথ্যা বানিয়ে প্রচার করার মতোও ঘটনা ঘটছে অহরহ।

এসব অপরাধ রুখতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬’ করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খসড়া আইনে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে কেউ গুজব ছড়ালে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, সাইবার স্পেসে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হচ্ছে।

ডাক ও টেলিযোযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণের জন্য গত ৮ জুলাই পাঁচ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়।

কমিটি খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী। কমিটি সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করছে। গত ১৫ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সভাকক্ষে কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করে কমিটি।
 
গত রবিবার আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনটির মূল লক্ষ্য হবে ডিজিটাল স্পেসে শালীনতা ফিরিয়ে আনা, নারী ও তরুণদের সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার আইনের মতো এত অল্প সময়ে এত সংশোধনী অন্য কোনো আইনে আনা হয়নি। তাঁরা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে জনবান্ধব আইন করার পরামর্শ দিচ্ছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ করা হয়। কিন্তু এই আইনের অপব্যবহার হওয়ায় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেক মানুষকে কারাভোগসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এতে জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়।

এরপর ভিন্নমত দমনে আইনটির অপব্যবহার শুরু হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে সংশোধন করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ’ করা হয়। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আবারও সেই আইন সংশোধন করে ২০২৫ সালের ২১ মে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৩০ এপ্রিল অধ্যাদেশ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস করা হয়। বিলটি পাস হওয়ার মাত্র তিন মাস পর আবারও সংশোধন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে আইনটির নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পেশাল জজ আদালত ঢাকা-৩-এর পাবলিক প্রসিকিউটর মো. জামাল উদ্দিন খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবার আইনটি যতবার সংশোধন করা হয়েছে, অন্য কোনো আইন অল্প সময়ে এত সংশোধন হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এখন সাইবার অপরাধ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এই অপরাধ রোধে কঠোর আইন হওয়া দরকার। ২০১৮ সালের আইনটির অপব্যবহার হয়েছে। নিরাপরাধ মানুষকে জেলে যেতে হয়েছে। এসব কারণে সমালোচনার মুখে আইনটি সংশোধন করা হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করব, বর্তমান সরকার এই আইনের যে সংশোধন করতে যাচ্ছে, তা যেন জনবান্ধব হয়। ’

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সমম্প্রতি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মেটা, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নিয়ে এরই মধ্যে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। এসব কনটেন্টের ক্ষতিকর দিক কিভাবে বন্ধ করা যায়, সেটিই মূল বিষয়। বিভিন্ন কনটেন্টকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে ও আলোচনা হচ্ছে। এসব কনটেন্টে অনেক পরিবারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে এবং অনেক পরিবারে আত্মহত্যার প্রবণতার কথাও শোনা যাচ্ছে। সে কারণে বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সংশোধিত আইনে নতুন একটি ধারা (২৬/ক) যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করবেন বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সংশোধিত আইনের খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাতে উল্লেখ থাকছে, গুজব অর্থ এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে অথবা অস্থিরতা তৈরি করার ঝুঁকি থাকে। অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ বা প্রচার করা হয়।

সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় নতুন দুটি শব্দ যোগ করা হচ্ছে। মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন-সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারো মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করতে কোনো তথ্য অডিও, ভিডিও চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য উপায়ে ধারণ বা সম্পাদিত, এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ অপরাধে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করে কিছু প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

টিআইবির শঙ্কা : এদিকে খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এ এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও মত প্রকাশের অধিকারসংক্রান্ত তিনটি ভিন্ন বিষয় এক আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে।