Image description

রাজধানীর বনানীর বেলতলা বস্তি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস। ডেসকোর মাধ্যমে এসব মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ৫ মিটারের অধীনে যুক্ত রয়েছে বস্তির প্রায় ১৬০০ পরিবার। বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া পরিবারগুলো নিয়মিত পরিশোধ করছেন বিলের টাকা। তবে এসব টাকা যাচ্ছে না সরকারের ঘরে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটপাট করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যার নেতৃত্বে রয়েছেন কুরুম। তিনি আত্মসাৎ করেছেন বিলের কোটি টাকা। যদিও এসব টাকা তুলতে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ডেসকো। তবুও তাকে আনা সম্ভব হয়নি আইনের আওতায়। বাধ্য হয়ে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন শুরু করেছে বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ইতোমধ্যেই ১২০০ পরিবারকে দেওয়া হয়েছে নতুন সংযোগ। সরেজমিন অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। কুরুমের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও উত্তর দেননি।

ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বেলতলা বস্তির বিদ্যুৎসংক্রান্ত বকেয়া, বকেয়া আদায়ের কার্যক্রম ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনরা অবগত। টাকা তুলতে মামলাও করা হয়েছে। তবুও টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ চুরি ও বিল বকেয়া থাকার সুযোগ থাকবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বেলতলা বস্তিতে মোট বৈদ্যুতের মিটার সংখ্যা ৫। এর মধ্যে-স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোহাগ ২, নায়েব আলী ১ ও জুনায়েদের নামে ২টি মিটার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা আত্মগোপনে। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মিটারগুলো নিয়ন্ত্রণে নেন স্থানীয় কুরুম, ইসরাফিল, কাজী রফিক, জিয়া ও রাজা। পরে এককভাবে নিজের ক্ষমতার প্রভাবে মিটারগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন কুরুম। স্থানীয় বেশকিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় বর্তমানে ডেসকোর মিটার নিজের নিয়ন্ত্রণেই রেখেছেন কুরুম।

সরকারের নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব বিদ্যুৎ সংযোগে তৈরি করেছে অদ্ভুত ‘পয়েন্ট’ হিসাব। মূলত টেলিভিশন, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক বাতিকে একটি ‘পয়েন্ট’ ধরা হয়। এসব প্রতি পয়েন্টে বস্তিবাসীকে গুনতে হয় ৩০০ টাকা। আর ফ্রিজ থাকলে সেটি ধরা হয় ‘ডাবল পয়েন্ট’। সে হিসাবে ফ্রিজে আদায় করে ৬০০ টাকা। পয়েন্ট হিসাবে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল গড়ে ২৫-৩০ লাখ টাকা তোলেন। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ বস্তির সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, গ্রহকের ব্যবহারের তুলনায় দ্বিগুণ বিল তুলছে কুরুম। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে বিচ্ছিন্ন করা হয় সংযোগ। নির্যাতন করা হয় ভুক্তভোগীকে। দেখানো হয় ভয়ভীতি। বস্তির বাসিন্দা মনি বেগম যুগান্তরকে বলেন, আমার ছয়টি রুম। প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় ৬ হাজার টাকা। কোনোভাবেই এত টাকা বিল আসে না। তবুও বাধ্য হয়ে দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের টাকা না দিলে লাইন কেটে দেওয়া হয়। শুনেছি এসব টাকা বিদ্যুৎ অফিসে দেওয়া হয় না। বিলের টাকা কুরুম ও তার লোকজন তুলে খায়।

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবু তালেব। তিনি যুগান্তরকে বলেন, টেলিভিশন, ফ্যান, লাইট ও ফ্রিজ মিলে আমাকে মাসে ১৩ হাজার টাকা বিল দিতে হয়। বাস্তবে আমরা কখনোই এত টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করি না। টাকা না দিলে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়। রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, আমি বাসায় যেভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। তাতে মাসে ১৫০০ টাকার বেশি বিল আশার কথা নয়। কিন্তু ৪ হাজার টাকা বিল দিতে হয়। কুরুমের এসব ক্ষমতার প্রভাব থেকে আমরা মুক্তি চাই।

ডেসকো সূত্রে, বেলতলা বস্তিতে ডেসকোর বর্তমান বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বকেয়া থাকা এসব টাকা উত্তেলন করে নিজের পকেটে নিয়েছেন অভিযুক্ত কুরুম। এসব টাকা তুলতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, অভিযান ও অভিযুক্ত কুরুমের বিরুদ্ধে মামলাও করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে অদৃশ্য শক্তির কারণে বকেয়া বিল তুলতে পারছেন না তারা। বাধ্য হয়ে প্রি-পেইড মিটার সংযোগ দিচ্ছেন তারা।

ডেসকোর মামলা ও গ্রেফতারের পরোয়ানা থাকলেও প্রকাশ্যেই চলাচল করছে কুরুম। যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং ও ব্যক্তিগত কার্যক্রমে। নিয়মিত যাতায়েত করছেন বেলতলা বস্তি এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, থানা-পুলিশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় তাকে গ্রেফতার করছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অথচ বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া থাকা ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলতে কুরুমের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গত বছরের ২০ ডিসেম্বর সমন জারি করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। তার নামে একাধিক মামলায় ওরেন্টও রয়েছে।

বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কুরুমের নামে ওরেন্ট আছে। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। বর্তমানে কুরুম আমাদের খাতায় পলাতক আসামি। অবশ্যই তাকে পেলে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।