সারা দেশে অসহনীয় লোডশেডিং। বিদ্যুৎসংকটে দিশাহারা মানুষ অসহায়।
অনেকেই বলছেন, সরকার কী করছে? জনগণের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ আর অসন্তোষ। কিন্তু এই সংকটের জন্য মাত্র ছয় মাস বয়সী বিএনপি সরকার কতটা দায়ী?
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের এই ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ আমলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত পাঁচ লুটেরা। তাঁরা জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। বিদ্যুৎ খাত ধ্বংস করে তাঁরা হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।
এই পাঁচ লুটেরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী, সাবেক সচিব আবুল কালাম আজাদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং তাঁর ছোট ভাই অপু। এই পাণ্ডবদের লুটপাটের কারণেই আজকের লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ বুঝতে প্রথমেই গাণিতিক ধাঁধার মুখোমুখি হতে হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট।
অন্যদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমেও সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আমাদের সক্ষমতা চাহিদার প্রায় দেড় গুণ। সাধারণ যুক্তিতে দেশে কোনো লোডশেডিং থাকার কথা নয়, বরং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে দেশ উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে চার হাজার থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াটে।
কারণ দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিরও বেশি হয় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, নয়তো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অনেক নিচে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন করতে না পারাটাই হলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এর জন্য প্রধানত দায়ী ওই পাঁচ লুটেরা এবং তৎকালীন সরকারের লুটপাটের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন।
আরো দুঃখজনক বিষয়, এসব কেন্দ্রের উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। এই কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ৩০০ মিলিয়নের ঘাটতি সরাসরি কয়েক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে নতুন গ্যাসকূপ খননের তাগিদ দিয়ে এলেও সেখানে বিনিয়োগ না করে জোর দেওয়া হয়েছে আমদানি করা এলএনজির ওপর। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে বা ডলার সংকট দেখা দিয়েছে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটি শুধু একটি কারিগরি সংকট নয়, নীতিগত ব্যর্থতা। লুটপাট করার অদ্ভুত এক সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। পায়রা ও রামপালের মতো বিশাল ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো যখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলে, তখন জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীলতা থাকে। কিন্তু মাসের পর মাস বকেয়া পরিশোধ না করায় ইন্দোনেশিয়া বা অন্য সরবরাহকারীরা কয়লা পাঠানো বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে। ফলে এই কেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। অন্যদিকে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র দুই হাজার মেগাওয়াট। বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) তথ্য মতে, যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাওয়া যেত, তাহলে এই খাত থেকেই আরো দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হতো। কিন্তু উদ্যোক্তারা তেল কিনতে পারছেন না, কারণ সরকারের কাছে তাঁদের প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি বকেয়া পাওনা আটকে আছে।
বিদ্যুৎসংকটের নেপথ্যে যে আইনি ও নীতিগত কাঠামোটি সবচেয়ে বেশি দায়ী তা হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সরকার তাদের একটি নির্ধারিত অর্থ প্রদান করতে বাধ্য থাকে, শুধু তারা প্রস্তুত আছে এই যুক্তিতে। বিশ্বের অনেক দেশে এই পদ্ধতি থাকলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ হয়েছে অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং বৈষম্যমূলকভাবে। চুক্তির শর্তগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে অনেক কেন্দ্রের মালিক বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে কেন্দ্র বসিয়ে রাখতেই বেশি আগ্রহী থাকেন, কারণ তাতে কোনো জ্বালানি খরচ ছাড়াই নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী বিদ্যুৎ উৎপাদনের আপৎকালীন সমাধানের জন্য বেসরকারি উদ্যোগের প্রস্তাব দেন এবং সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বিদ্যুৎসচিব করা হয় আবুল কালাম আজাদকে। আবুল কালাম আজাদ বিদ্যুৎসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ‘কুইক রেন্টাল’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। এ জন্য আইন সংশোধন করা হয়। এর মাধ্যমে দুর্নীতির ফ্লাডগেট উন্মোচন করেন আবুল কালাম আজাদ। বলা হয়, দ্রুত বিদ্যুৎসংকট মোকাবেলার জন্য ‘কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র’ স্থাপন করতে হবে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যাঁরা স্থাপন করবেন, তাঁদের বিদ্যুৎ সরকার কিনুক না কিনুক তাঁদের ডলারে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রদান করা হবে। আবুল কালাম আজাদ শুধু এ রকম একটি বিধিবদ্ধ আইন ব্যবস্থাই করেননি, বরং এসব দুর্নীতি ও লুণ্ঠন যেন আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে থাকে, সে জন্য দায়মুক্তি আইন বা ইনডেমনিটি অ্যাক্ট করেছিলেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে লুণ্ঠনের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা কুইক রেন্টালের জন্য আবেদন করতে থাকেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেনের বিনিময়ে বিদ্যুতের কুইক সেন্টারের লাইসেন্স দেওয়া শুরু হয়। বিদ্যুৎ খাত হয়ে ওঠে হরিলুটের আখড়া।
টানা ১০ বছরের বেশি সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন নসরুল হামিদ বিপু। এ সময় তিনি এই মন্ত্রণালয়কে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন এবং ১০ বছর ধরে রীতিমতো লুটের উৎসব করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মতে, তাঁর দুর্নীতির কাহিনি আরব্য রজনীর রূপকথাকেও হার মানায়। শুধু বিপু একা নন, ভাই, স্ত্রী, ছেলে, মামা—সবাই লুটেছেন বিদ্যুৎ খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থ। ১০ বছরে বিপুর লুণ্ঠনের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। তাঁর রাজত্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টাকাই ছিল শেষকথা। নিজেই কম্পানি খুলে হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। গড়েছেন দুর্নীতির পারিবারিক সিন্ডিকেট। এর উদাহরণ মাতারবাড়ী প্রকল্প।
জাপানের মারুবেনি করপোরেশন, ডাচ-সুইস জ্বালানি কম্পানি ভিটল এবং পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি কম্পানির যৌথ ব্যাবসায়িক জোট বা কনসোর্টিয়ামকে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের বৃহত্তম এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিপু। এই কনসোর্টিয়াম আসলে ছিল বিপুর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে সে সময় ৩০৫ মিলিয়ন ডলার বা আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে টার্মিনালটি নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু মাত্র ১০০ ডলার পরিশোধিত মূলধনের একটি কম্পানি পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল কিভাবে ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের কাজ পাওয়া একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হতে পারে? অনুসন্ধানে দৃশ্যপটে আসেন তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু স্বয়ং। পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল কম্পানি হিসেবে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশে নিবন্ধিত।
নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল নামের এই কম্পানিটির নিয়ন্ত্রক নসরুল হামিদ বিপুর আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামিদ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহীরাই পাওয়ারকোর হর্তাকর্তা। একসময় নসরুল হামিদ নিজেই ছিলেন হামিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান। পারিবারিক এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সাবসিডিয়ারি কম্পানির মাধ্যমে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করত। এর কয়েকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও ছিলেন বিপু।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ শেয়ারের মালিক তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। পাওয়ারকোর প্রধান শেয়ারধারী কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি নসরুল হামিদ বিপুর আপন মামা। তাঁর ছেলে, ভাই ও ভাইয়ের ছেলেরা হামিদ গ্রপের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন এবং করছেন।
পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনালের একজন বিকল্প পরিচালক মুরাদ হাসান। তিনি কম্পানিটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা বা সিও হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মুরাদ হাসান বিপিসির সঙ্গে সরাসরি মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্পের দর-কষাকষিতে অংশ নিয়েছিলেন।
এই মুরাদ হাসানই আবার ডেলকো বিজনেস অ্যাসোসিয়েট নামের হামিদ গ্রুপের একটি সাবসিডিয়ারি কম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় নসরুল হামিদ হলফনামায় জানান, তিনি নিজেই ডেলকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সে সময় তিনি কম্পানিটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ারেরও মালিক ছিলেন। বর্তমানে ডেলকোর মালিকানা তাঁর ছেলে জারিফ হামিদ ও ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদের হাতে।
ডেলকো ও আলোচিত পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল প্রথম নিবন্ধিত হয়েছিল বারিধারার ৩২ প্রগতি সরণির ঠিকানায়। এই ঠিকানায় কেইমরিচ, সুনন ও ইউরো নামের তিনটি ফার্নিচার ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে। বাংলাদেশে এই বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর পরিবেশক ডেলকো। ডেলকোর ওয়েবসাইটেও তাদের শোরুমের ঠিকানা : ৩২ প্রগতি সরণি, বারিধারা। আবার সুনন বাংলাদেশ বা সুমন বিডি ডট কম ডোমেইনটির রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী, এ ঠিকানায়ই ইন্তেখাবুল হামিদের নামে নিবন্ধিত হয়েছে ডোমেইনটি। অর্থাৎ ডেলকোর শোরুমের ঠিকানায়ই নিবন্ধিত হয়েছিল পাওয়ারকো।
বিপুর ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু নিজেও হামিদ গ্রুপের একাধিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর সঙ্গে পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল খানের সংযোগ রয়েছে। ভারতীয় এই নাগরিক দুবাইভিত্তিক একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি শিপিং লাইনের মধ্যপ্রাচ্য শাখা পরিচালনা করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, পাওয়ারকোর সঙ্গে জড়িত আরেক ব্যক্তি হলেন কম্পানিটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক তারেক খলিল উল্লাহ, যিনি দীর্ঘদিন হামিদ গ্রুপে কর্মরত ছিলেন এবং ইন্তেখাবুল হামিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। হামিদ গ্রুপের আরো দুজন কর্মকর্তা পাওয়ারকো গঠনের সময় আরজেএসসি অফিসে উপস্থিত ছিলেন। কম্পানি হিসেবে পাওয়ারকোর নিবন্ধনের সময় এই দুজনকে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়।
জাহাঙ্গির আলম নামের একজন সাক্ষীর পরিচয়পত্র ও প্রোফাইলে জানা যায়, তিনি হামিদ গ্রুপের একজন সহকারী ব্যবস্থাপক।
নসরুল হামিদ বিপুর মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের কাজ পায় মারুবেনি, ভিটল, পাওয়ারকো ও ডেলকো। কোনো দরপত্র ছাড়াই এলএনজি সরবরাহের কাজটি তিন দফায় পেয়েছিল ডাচ-সুইস ভিটল। আবার এই ভিটলের সঙ্গেই যৌথভাবে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনালের ৩০ শতাংশ মালিকানা পায় পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পেট্রোবাংলার কাছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি সরবরাহের তিনটি কাজ ভিটল পায় পাওয়ারকোর সঙ্গে তাদের কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হওয়ার পর। কনসোর্টিয়াম গঠনের পর বিপুর মন্ত্রণালয় থেকে আরেক সদস্য মারুবেনিও একই প্রক্রিয়ায় কাজ পায়। ২০২১ সালের মে মাসে মারুবেনি ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইজিসিবি) সঙ্গে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।
ইজিসিবিও ছিল নসরুল হামিদ বিপুর নিয়ন্ত্রণাধীন। ভিটল ও মারুবেনিকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে নাইজেরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি প্রকল্পের কাজ পেতে ঘুষ প্রদানের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে শতাধিক মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হয় মারুবেনি। এরই সূত্র ধরে ৯ মাসের জন্য তাদের অর্থায়নে হওয়া প্রকল্পে মারুবেনির অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল জাপানের বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভিটলের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও মেক্সিকোতে ঘুষ প্রদানের দায়ে মার্কিন বিচার বিভাগের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে প্রসিকিউশন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার একটি চুক্তি করে, যার অংশ হিসেবে ১৬৪ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেয় ভিটল।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, নসরুল হামিদের ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু ও সাবেক সেতুমন্ত্রীর ভাতিজা মিলে অন্তত চারটি কম্পানির মাধ্যমে পাঁচ বছরে হাতিয়ে নেন আট হাজার কোটি টাকার কাজ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঢাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি (ডিপিডিসি) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কম্পানি (নেসকো) থেকে অ্যাডভান্স মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার নামের দুটি প্রকল্প হাতিয়ে নেন। এই দুটি প্রকল্পের অর্থমূল্য ছিল দুই হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে একই কম্পানি মোবাইল অ্যাপস অ্যান্ড কাস্টমার পোর্টাল প্রতিষ্ঠার নামে ডিপিডিসি থেকে হাতিয়ে নেয় আরো একটি মেগাপ্রকল্প। এই প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫০০ কোটি টাকা। নসরুল হামিদের ভাই একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি নামে আটটি মেগাপ্রকল্প হাতিয়ে নেন।
এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১ জুন বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) থেকে হাতিয়ে নেন ৫০ লাখ মিটার স্থাপনের কাজ। এই প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সাধারণত একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত কমপক্ষে ২০টি ধাপে তৎকালীন সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হতো। গত দুই বছরে ২৭টি সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে নসরুল হামিদের ছোট ভাই ইন্তেখাবুল হামিদ অপু পান দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এভাবেই বিগত ১০ বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় হয়ে উঠেছিল বিপুর পারিবারিক সম্পত্তি।
জানা যায়, নসরুল হামিদ বিপু দেশে টাকা নিতেন না। ঘনিষ্ঠদের তিনি বলতেন, ‘টাকা দেখলে ঘেন্না লাগে।’ ডলার কিংবা ইউরোতে আসক্তি ছিল তাঁর। তাঁর দুর্নীতির অর্থের লেনদেন হতো বিদেশে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে বিপু ও তাঁর পরিবারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে অনেকেই মনে করেন, আরো অনেক দেশেই বিপুর লুণ্ঠনের টাকা রয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব দেশে বিপুর অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বারমুডা, মাল্টা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, মোনাকো, সাইপ্রাস ও তুরস্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি কম্পানি খুলে ওই কম্পানির মাধ্যমে নসরুল হামিদ বিপুর হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কম্পানিটি প্রতিষ্ঠাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত নিজের বাসভবনের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন বিপু। পাঁচ বেডরুমের ওই বাসার বাজারমূল্য ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪১৫ মার্কিন ডলার; বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সেখানে শরীফ হায়দার নামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে স্ত্রী সীমা হামিদকে নিয়ে পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ট্রেড করপোরেশনের লাইসেন্স নেন। এই করপোরেশনের আওতায় মোবিল গ্যাস স্টেশনসহ দেড় ডজনের মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ফ্লোরিডায় অবস্থিত ওই গ্যাস স্টেশনটি কেনা হয় কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, শরীফ হায়দারের মাধ্যমেই হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছেন বিপু।
জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিপুর স্ত্রী সীমা হামিদের নামে তিনটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। বিপুর ছেলে জারিফ হামিদ দুবাইয়ে পাম বিচে বিলাসবহুল বাংলোতে বসবাস করেন। সেখানে তাঁর একাধিক ব্যবসা রয়েছে। লন্ডনে স্টাটফোর্ড এলাকায় রয়েছে বিপুর বাড়ি। এ ছাড়া ম্যানচেস্টারে বিপুর ব্যবসা রয়েছে। কানাডায় বিপুর একটি আবাসিক হোটেল এবং একটি পেট্রল পাম্প রয়েছে। বিপুর অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরে স্টক এক্সচেঞ্জ নিবন্ধিত। সেখানে রয়েছে বিপুর হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। মাল্টায় বিপুর স্ত্রী সীমা হামিদের নামে একটি বার ও ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ায় জারিফ রবার ফ্যাক্টরির বেশির ভাগ শেয়ার আছে বিপুর ছেলে জারিফের নামে। এই শেয়ারের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠিত এসব টাকায় বিভিন্ন দেশে রয়েছে বিপুর সম্পদের পাহাড়। দেশেও বিপুর হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। সেসব সম্পদ দেখাশোনা করছেন ইউনুস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী। ধারণা করা হয়, রিজওয়ানার কারণেই বিপুর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান মামলা নেই।
বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের শেষ খলনায়ক ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎসচিব, পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ছিলেন দুই বছরের কম সময়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই তিনি বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ লুণ্ঠন করেছেন বলে অভিযোগ আছে।
বিগত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে কোনো পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি; হয়েছে পরিকল্পিত লুটপাট। ফলে এখন গলা পর্যন্ত ঋণে জর্জরিত বিদ্যুৎ খাত। আজকের এই লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী বিদ্যুৎ নিয়ে বিগত সরকারের লুণ্ঠননীতি।