বাদাম বিক্রেতা থেকে শুরু করে বনেদি ব্যবসায়ী; জেলে থেকে জুয়ার বোর্ড; মাঠ থেকে ঘাট দখল, ঘর কিংবা চর দখল-কিছুই বাদ যাচ্ছে না। হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী, টমটমচালক থেকে ট্রাক-লরিচালক, বিমানের যাত্রী থেকে চোরাকারবারি-সব খাত থেকেই তার নামে উঠছে চাঁদা। কর্ণফুলীর তীরে অবস্থিত চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকাটি এখন তার হাতেই জিম্মি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাকার মেশিন পাওয়া এই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক। আর এ পদবিই তাকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য। উত্তর পতেঙ্গার ধুমপাড়ার বাসিন্দা আলমগীরের পকেটে কর্ণফুলীর স্রোতের মতোই যেন প্রতিদিন ঢুকছে চাঁদার টাকা! এই চাঁদা আদায়ে অন্যতম সহযোগী হিসাবে কাজ করছেন তার ভাই স্বেচ্ছাসেবক দলের পতেঙ্গা থানা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম এবং পতেঙ্গা থানা ছাত্রদলের সভাপতি রাব্বী হোসেন রিমন।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তর পতেঙ্গা এবং দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে চাঁদাবাজির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ বা ‘দানব’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন এই নেতা। তাকে চাঁদা না দিয়ে এখানে কেউই ব্যবসা করতে পারছেন না। মালিকানাধীন জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিনব কৌশলও নিয়েছেন আলমগীর ও তার লোকজন।
ভুক্তভোগী কেউ কেউ কৃষক দলের এই নেতার হয়রানি, চাঁদাবাজি ও জিম্মিদশার বিষয়ে অভিযোগ দিলেও বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করছেন না। গত আড়াই বছর বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন আলমগীর। কিনেছেন বিলাসবহুল পাজেরো জিপ। তার ভাই জাহাঙ্গীরও চড়েন নিজস্ব গাড়িতে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আলমগীরের প্রথম নজর পড়ে পতেঙ্গায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীর ১১ নম্বর খেয়া পারাপার ঘাটে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে এই ঘাট একসনা ইজারা নিয়ে খাস কালেকশনে নিয়োজিত ছিলেন মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা। আলমগীরের লোকজন ইজারাদারের লোকজনকে মারধর করে তুলে দিয়ে ঘাটটি দখল করে নেন। খাস কালেকশনের প্রতিদিনকার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঢোকান নিজের পকেটে। ৬ মাস পর ইজারাদারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতি বৈদ্য অভিযান চালান। ওই ঘাট থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের সময় হাতেনাতে আটক করে নিয়ে আসেন আলমগীরের বেশ কয়েকজন লোককে। মিজানুর রহমান জানান, পরে আলমগীর খেয়াঘাটের দখল ছেড়ে দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে আনেন। তবে ওই ৬ মাসে আলমগীর পকেটস্থ করেছেন অর্ধকোটি টাকার মতো।
এরপর তার নজর পড়ে পতেঙ্গা ও নেভালের পর্যটন এলাকায় থাকা ১৬টি হোটেলের ওপর। অভিযোগ আছে, একেক দিন একেক হোটেলে গিয়ে আলমগীরের লোকজন চাঁদার দাবিতে হোটেলে তালা মেরে দিয়ে আসেন। এককালীন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে দাবি করেন প্রতিটি হোটেলে। এছাড়া প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদাও ধার্য করে দেন। ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থে বেশির ভাগ হোটেল মালিক তাদের এই দাবি মেনে নেন। এ খাতেই এককালীন ৭০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা যায় আলমগীর সিন্ডিকেটের পকেটে। হোটেলগুলোর মধ্যে রয়েছে বরিশাল হোটেল, সমুদ্র বিলাস, সী-মুন, টানেল ভিউ, পতেঙ্গা টুডে, ডায়মন্ড, স্বপ্ন বিলাস, বেলমন্ড, বীচ ভ্যালি, বিচ ভিউ প্রভৃতি। এছাড়া দলীয় কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেও প্রতিটি হোটেল থেকে আদায় করেন চাঁদা।
টানেল রোডের মুখ থেকে চরপাড়া পর্যন্ত প্রায় দশ কানি বা চার একর খালি জায়গা রয়েছে বনেদি ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের। ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এককালীন ২ কোটি টাকা দিয়ে জায়গাটি ভাড়ায় নেওয়ার কথা বলে পুরোটাই দখল করে নেন আলমগীর। পরে মালিককে মাত্র ২০ লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে ভাড়ার বাকি টাকা নিয়ে গড়িমসি করতে থাকেন। আর ওই জায়গা তৃতীয় পক্ষের কাছে ভাড়া দিয়ে সব টাকা পকেটস্থ করছেন আলমগীর।
সূত্র জানায়, কাটগড় এলাকায় রয়েছে এসএপিএল ও ওসিএল নামে দুটি কনটেইনার ডিপো। এই ডিপোর মালিকপক্ষ থেকে বিনা পয়সায় ১০টি সিরিয়াল নিয়ে তা ট্রাক-লরি মালিকদের কাছে বিক্রি করে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। সিরিয়াল না পেলে ডিপো থেকে কনটেইনার পরিবহণের সুযোগ নেই।
জানা যায়, ইলিশ মৌসুমে পতেঙ্গা উপকূলের জেলেরা মাছ ধরতে যান বঙ্গোপসাগরে। মাছ ধরার জন্য সাগরে বাঁশ গেড়ে বা মার্কিং দিয়ে এলাকা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। যাকে বলা হয় ফাঁড়। এই ফাঁড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জেলেদের এক প্রকার জিম্মি করে রাখেন আলমগীর। প্রতিটি ফাঁড়ের বিপরীতে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় তাকে। বিমানবাহিনী থেকে ইজারা নিয়ে পতেঙ্গা এলাকায় তিনটি প্রজেক্টে মাছ চাষ করতেন ৬ ইজারাদার। আলমগীর ওই ৬ অংশীদারের চারজনকে আওয়ামী লীগ তকমা দিয়ে প্রজেক্ট থেকে বের করে দেন। প্রজেক্টের মাছ কমিশনে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে বিপুল টাকা পকেটে পুরেন আলমগীর ও তার সহযোগীরা। পক্ষান্তরে জামাল উদ্দিন রাজুসহ অন্য ইজারাদাররা ৭০/৮০ লাখ টাকা লোকসানে পড়েন। জামাল উদ্দিন রাজু যুগান্তরকে বলেন, আলমগীর তাদের দুই অংশীদারকে হাত করে প্রজেক্টগুলো জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক রাশেদ আলীর মালিকানাধীন দক্ষিণ পতেঙ্গা মৌজার একটি জায়গায় নিজের নাম লিখে মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড তুলে দেন আলমগীর। রাশেদ ঝামেলা এড়াতে পূবালী ব্যাংকের ১ লাখ টাকার একটি চেক পাঠান আলমগীরের কাছে। ওই চেকটি (নম্বর: ০৯৩৩৬৮০ তাং: ১৫/১২/২৫) একই তারিখে পূবালী ব্যাংক, উত্তর পতেঙ্গা শাখায় জমা দিয়ে টাকা তোলেন পতেঙ্গা থানা ছাত্রদল সভাপতি রাব্বি হোসেন রিমন। রাশেদ অভিযোগ করেন, এর কিছু দিন পর আবারও একই জায়গায় সাইনবোর্ড তুলে দেন আলমগীর। যদিও এবার সাইনবোর্ডে তার পরিবর্তে ছাত্রদল নেতা রিমনের নাম লেখা হয়। আবার রাশেদ আলমগীরকে ফোনে কল করলে তিনি বলেন ছাত্রদল সভাপতি রিমনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তিনি বুঝতে পারেন, আবারও টাকার জন্য সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করে সরাসরি পুলিশ কমিশনারকে লিখিত অভিযোগ দেন। ১০ আগস্ট প্রদত্ত ওই অভিযোগে তিনি নগর কৃষক দলের সভাপতি আলমগীর ও পতেঙ্গা থানা ছাত্রদল সভাপতি রিমনের বিরুদ্ধে দখলবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য পাঠানো হয় ওসির কাছে।
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ আলী বলেন, পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে পাঠানো অভিযোগটি তদন্তাধীন। এটি মালিকানা বিরোধ নাকি চাঁদাবাজির ঘটনা, বিষয়টি তদন্তে বের হয়ে আসবে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, রাত ১২টার পর পতেঙ্গার চিত্র বদলে যায়। এখান থেকে মিয়ানমারে যায় সার, সিমেন্ট, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য। আর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের চালান। যার বড় অংশ পতেঙ্গা উপকূল দিয়ে আসে। এছাড়া বিদেশি জাহাজ থেকে নামে নিষিদ্ধ মদ-বিয়ার। কালোবাজারির তেল বিক্রিও হয়ে ওঠে জমজমাট। এ চোরাচালান ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও আলমগীর এবং তার লোকজনের হাতে। ঘাটে ঘাটে তার লোকজন চোরাই পণ্য খালাস ও পাচারে পাহারা দেয়। বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হয়ে আসে সোনা, সিগারেট।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, চোরাকারবারিরা আলমগীরকে ম্যানেজ না করে পতেঙ্গা পার হওয়ার সাহসও করে না। দুই পতেঙ্গার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে আড়াই থেকে তিন হাজারের মতো টমটম ও এইচপাওয়ার গাড়ি চলে। প্রতিটি গাড়ি ভর্তিতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা করে নেয় আলমগীরের সিন্ডিকেট। মামলা বাণিজ্য করে বিপুল টাকা আয় করেছেন তিনি। স্থানীয়রা জানান, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের ৪০০ দোকান থেকেও বিপুল অঙ্কের চাঁদা যায় আলমগীরের পকেটে।
আলমগীরের বক্তব্য : সব অভিযোগই একবাক্যে অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম নগর কৃষক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতিত হয়েছি। ২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের হাতে আটক হয়েছি। পতেঙ্গার সবকিছুই আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা নিয়ন্ত্রণ করত। চাঁদাবাজিও করত তারা। আমার বিরুদ্ধে হোটেলে চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, ঘাট দখলের যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে তা মিথ্যা। আমি উলটো হোটেল ব্যবসায়ীদের বলেছি, যাতে কাউকে চাঁদা না দেয়। তার নামে কেউ চাঁদা চাইলে তাদের আটক করতে বলেছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী রাশেদের জায়গাটি বিরোধপূর্ণ। সেটির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ছাত্রদল নেতা রিমনের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি আরও বলেন, আমার মাঠ আছে। নেতাকর্মী আছে। যারা ওয়ানম্যান শো নেতা, তারাই আমার বদনাম করছে। আর কাজ করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি, সমালোচনা হতেই পারে।