চারপাশে ভয়ংকর অপরাধীচক্র সক্রিয়। নানা মুখোশের আড়ালে তারা বেপরোয়া।
কখনো নাম পরিচয় বদলিয়ে, কখনো ঠিকানা কিংবা পদ-পরিচয় গোপন করে একের পর এক অপরাধ করে চলছে তারা। এক জায়গায় ধরা পড়লেও আগের অপরাধ শনাক্তকরণে দুর্বলতা কিংবা সমন্বয়হীনতার কারণে অপরাধের মাত্রা যাচাই করা যাচ্ছে না। আবার সরকারি চাকরিতে যত সহজে অপরাধী চিহ্নিত করা যায়, বেসরকারিতে তা করার কোনো উদ্যোগ নেই। গৃহকর্মী, দারোয়ান থেকে কর্মকর্তা কিংবা করপোরেট নির্বাহী—কারো ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ একক ডেটা বেইস বা তথ্যভাণ্ডার নেই।
এক জায়গায় তথ্য যাচাইয়ে মিলছে না সার্বিক তথ্য। ফলে অপরাধী একেক জায়গায় একেক অপরাধ করেও থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। চাকরি, বাসাভাড়া কিংবা ব্যাবসায়িক সম্পর্ক—একজন মানুষের বর্তমান পরিচয় যাচাই করাই এখনো অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করছে কাগজপত্র, স্থানীয় পরিচিতি ও মৌখিক তথ্যের ওপর। তথ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ না থাকায় অপরাধীর অতীত নিয়ে যাচাই অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, কেস স্টাডি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সর্বশেষ আলোচনায় আসে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে মুখে ও দুই হাতে স্কচ টেপ পেঁচানো ইসমাঈল হোসেনের (৪৯) লাশ বাস থেকে ফেলে যাওয়ায় জড়িত বাসচালক এবং এক সহযোগী আটকের ঘটনাটি। ওই বাসের সুপারভাইজার সাজুর বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতির মামলা এবং চালক সোহেলের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি ও দুটি মাদকের মামলা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে। এর পরও কিভাবে সাজু বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসল—এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
জানতে চাইলে বনানী থানার ওসি (তদন্ত) মেহেদী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের পেশায় সাধারণত পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই করার প্রবণতা কম। ফলে চাকরি পেয়ে তারা ওই সুযোগটি (অপরাধ) নিয়েছে। যদি যাচাই করে বাসে চাকরি দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এমন ঘটনাটি না-ও ঘটতে পারত।’
জানা যায়, থানাগুলোতে পর্যাপ্ত বায়োমেট্রিক পদ্ধতি না থাকার কারণে একাধিক মামলার আসামিরাও গ্রেপ্তারের পর নাম-ঠিকানা বদলে ফেলে, পরবর্তী সময়ে কারাগারের বায়োমেট্রিক পরীক্ষায় তাদের আসল পরিচয় উঠে আসার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গত এক বছরে শুধু কুমিল্লা কারাগারেই এমন ২৩ জনের ঘটনা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধীর তথ্য এক জায়গায়, নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধ গোপন রেখে চাকরি কিংবা ব্যবসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনকি সরকার আন্তরিক হলে একটি সিস্টেমে একজন ব্যক্তির সব তথ্য একটি কার্ডেও নিয়ে আসা সম্ভব। সেখানে তার সব তথ্য থাকবে, গুরুতর অপরাধী হলে রাষ্ট্রের নাগরিক সুবিধা পেতে গেলে তার অপরাধ ধরা পড়বে—এমন সিস্টেম চালু করা জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া দেওয়ার আগে বাড়ির মালিক সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি, কর্মস্থলের তথ্য কিংবা পরিচিত কারো রেফারেন্স নেন। অনেক সময় ভাড়াটিয়াদের কিছুই নেওয়া হয় না। আর সেসব ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের অন্য কোনো জেলায় মামলা আছে কি না, আগে কোনো অপরাধে সাজা হয়েছিল কি না, তা জানার বৈধ ও সহজ কোনো উন্মুক্ত ব্যবস্থা সাধারণ বাড়িওয়ালার হাতে নেই। যেমন—ঢাকার মধ্য বাড্ডায় একটি ডাকাতির ঘটনায় পুলিশকে এমন সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যক্তি ভাড়াটিয়া সেজে প্রায় এক মাস অবস্থান করার পর ঈদের ছুটিতে বাড়িওয়ালার বাসায় ডাকাতি করে। পরে তদন্তে দেখা যায়, ওই ভাড়াটিয়াদের তথ্যই ছিল না। ফলে তাদের শনাক্ত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে বেগ পেতে হয়। এ ছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যাচাই ছাড়া বাসায় কাজ নেওয়া এক কর্মী চুরি করতে গিয়ে গৃহকর্মী ও তাঁর মেয়েকে খুন করে। মূলত অতীতের পরিচয় না জেনে বিশ্বাস করার কারণেই এসব ঘটনা ঘটে।
সরকারি চাকরিতে যাচাই, বেসরকারিতে অন্ধকার : সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আগে প্রার্থীর তথ্য যাচাইয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হয়। পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থায়ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে চাকরি বা অন্য কাজের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট জেলা ডিএসবি বা মহানগর এলাকায় সিটি এসবির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে একই ধরনের কেন্দ্রীয় যাচাই ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। একটি কম্পানি কর্মী নিয়োগের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার সনদ ও রেফারেন্স যাচাই করতে পারে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মামলা বা সাজা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, দ্রুত ও আইনসম্মত যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে একই ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় যে ধরনের যাচাইয়ের মুখোমুখি হয়, বেসরকারি চাকরিতে অনেক সময় তার সামান্য অংশও হয় না। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাইলে পুলিশের কাছে আবেদন করলে কর্মীর ব্যাপারে মামলা আছে কি না সেটা যাচাই করতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মামলা থাকা আর অপরাধী হওয়া এক বিষয় নয়। কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মানেই তিনি অপরাধী নন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে দোষী নন। তাই এমন কোনো ডেটাবেইস হলে সেখানে মামলা, অভিযোগ, খালাস, দণ্ড—প্রতিটি অবস্থা আলাদা করে দেখানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তবে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, তাদের ক্রাইম ডেটাবেইসে আসামির সব মামলার তথ্য রয়েছে।
চারিত্রিক সনদই শেষ ভরসা, প্রকৃতপক্ষে তার ভিত্তি কতটুক : চাকরি বা বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এখনো চারিত্রিক সনদ গুরুত্বপূর্ণ নথি। সরকারি ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্মে চারিত্রিক সনদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রও প্রয়োজনীয় নথির তালিকায় রয়েছে। কিন্তু চারিত্রিক সনদকে অপরাধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হিসেবে দেখা যায় না। কারণ একজন ব্যক্তি কোথায় কোথায় ছিলেন, কোন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কোন মামলায় কী ফল হয়েছে—এসব তথ্য যাচাইয়ের জন্য শুধু একটি সনদ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেকে।
ভাড়াটিয়ার অতীত জানবেন কে? : দেশের শহরগুলোতে বাড়িওয়ালা সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ফোন নম্বর ও কর্মস্থলের তথ্য সংরক্ষণ করেন। কোথাও কোথাও স্থানীয় থানায় ভাড়াটিয়ার তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু এসব তথ্যের সঙ্গে দেশের অন্য এলাকার অপরাধসংক্রান্ত তথ্যের কার্যকর সংযোগ না থাকলে শুধু বর্তমান ঠিকানা দিয়ে একজনের অতীত যাচাই করা কঠিন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীতে ভাড়াটিয়াদের জন্য নাগরিক ফরম আছে, সেটি বাড়ির মালিকরা পূরণ করে থাকেন।’
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যেমন—গত শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে প্লট ও ফ্ল্যাট মালিকদের ভাড়াটিয়া যাচাই করে বাসা ভাড়া দেওয়ার আহবান জানিয়েছে র্যাব।
র্যাব-২ সিপিএসসির কম্পানি কমান্ডার হাসান মুহাম্মদ মুহতারিম বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকার বিভিন্ন হাউজিংয়ে প্লট মালিকরা খালি প্লট ভাড়া দিয়ে থাকেন। এসব প্লটে অনেক সময় ছাপরা তুলে বাছবিচার না করে শ্রমজীবী মানুষকে ভাড়া দেওয়া হয়। শ্রমজীবীর পরিচয়ের আড়ালে অনেক অপরাধী এসব স্থানে আশ্রয় নিয়ে এলাকায় অপরাধপ্রবণতা তৈরি করছে এবং মাদকের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
এক অপরাধী, নতুন পরিচয় : একই ব্যক্তির বারবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের অনেকে একাধিকবার আইনের আওতায় এলেও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে ছাড়া পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এটি অপরাধের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রশ্নকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
সাম্প্রতিক আরেক ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তিকে ‘রিপিট অফেন্ডার’ বা পুনরাবৃত্ত অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, তিনি আগে সাইবার অপরাধের মামলায় চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। পরে ভুয়া পরিচয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতারণার অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার হন।
তথ্য আছে, কিন্তু সংযোগ নেই : বাংলাদেশে অপরাধ ও বিচার সংক্রান্ত তথ্য একেবারেই নেই, বিষয়টি তা নয়। পুলিশের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার আছে। আদালতের রয়েছে মামলা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সেবা। ই-কোর্ট ব্যবস্থায় অপরাধসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের ব্যবস্থাও রয়েছে। বিচার বিভাগের পোর্টালে মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইন জিডি, জামিন যাচাইসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু আছে। কারাগারেও বন্দিদের তথ্য সংরক্ষিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ, আদালত, কারাগার, প্রসিকিউশন ও আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে।
জাস্টিস অডিট বাংলাদেশ-এর তথ্যেও পুলিশ, আদালত, কারাগার ও প্রবেশন ব্যবস্থার আলাদা ডেটাসেটের উপস্থিতি দেখা যায়। একই সঙ্গে তাদের বিশ্লেষণে পুলিশ, আদালত ও কারাগারের তথ্য সংগ্রহ ও গণনার পদ্ধতিতে পার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, তথ্য থাকা আর তথ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ থাকা এক বিষয় নয়। একটি আদর্শ ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তির পরিচয়ের সঙ্গে মামলা নম্বর, আদালতের অবস্থা, জামিন, খালাস, সাজা ও কারামুক্তির তথ্য প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু সেই তথ্যের প্রবেশাধিকার প্রয়োজনভিত্তিক; একই সঙ্গে সেসব তথ্য আপডেট থাকাও জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতের ইন্টার-অপারেবল ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের (আইসিজেএস) মডেলে পুলিশ, আদালত, কারাগার, প্রসিকিউশন, ফরেনসিকসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাকে এক প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্যই হলো একই তথ্য বারবার আলাদাভাবে প্রবেশ না করিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপদ তথ্য বিনিময়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সম্ভাব্য মডেল হতে পারে; তবে সরাসরি কপি নয়, দেশের আইন ও নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নিজস্ব কাঠামো প্রয়োজন।
ডেটাবেইস জরুরি, কিন্তু কার জন্য উন্মুক্ত : অপরাধীর ডেটাবেইস জরুরি, তবে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে না, উচিত হবে না বলে কথা উঠেছে। এদিকে গত আগস্টে হাইকোর্ট নাগরিকদের এনআইডির সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তথ্য যুক্ত করা এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের তথ্যের একটি ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরির বিষয়ে রুল জারি করেছেন। মামলাটিতে নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের সুরক্ষার মতো সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়ও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষার জন্য ২০২৫ সালে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছে। একই সময়ে ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ও প্রণীত হয়েছে। তাই অপরাধসংক্রান্ত ডেটাবেইস তৈরির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব দিকে নজর রেখে সমাধান যেভাবে : বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি কার্যকর ব্যবস্থায় কয়েকটি স্তর থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, সীমিত অ্যাকসেস। সাধারণ মানুষ নয়; পুলিশ, আদালত, কারাগার, প্রসিকিউশন ও অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য দেখতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট পেশার জন্য যাচাই-বাছাই। শিশু, বয়স্ক, রোগী বা আর্থিক সম্পদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন এমন পেশায় নিয়োগের আগে অধিকতর যাচাইয়ের বিধান থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, শুধু দণ্ডপ্রাপ্তির তথ্য যাচাইযোগ্য করা। বিচারাধীন মামলা ও অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে দেখানো যাবে না।
চতুর্থত, খালাসপ্রাপ্তদের সুরক্ষা। আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত ব্যক্তির তথ্যকে অপরাধীর তালিকায় রেখে দেওয়া যাবে না। তথ্য অপব্যবহার রোধসহ ডেটাবেইসে মামলার চূড়ান্ত ফলাফল বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করতে হবে।
পঞ্চমত, অডিট ট্রেইল। কে কখন কোন ব্যক্তির তথ্য দেখেছে তার ডিজিটাল রেকর্ড থাকতে হবে। এতে ভেতরের কেউ তথ্য বিক্রি বা ফাঁস করলে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া তথ্য সুরক্ষার আইন ও প্রযুক্তি।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধীর ডেটাবেইস মানে মানুষের গায়ে ‘অপরাধী’ তকমা লাগানোর ব্যবস্থা নয়; বরং এটি হতে পারে আইনের শাসন, জননিরাপত্তা এবং ন্যায্য যাচাইয়ের একটি অবকাঠামো।
একজন ব্যক্তি কোথায় থাকেন, কোথায় চাকরি করেন বা কী পরিচয়ে নিজেকে উপস্থাপন করেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রীয় নথিতে তাঁর মামলার প্রকৃত ও হালনাগাদ অবস্থান কী। তবে নিরাপত্তার নামে যদি নির্দোষ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সবার হাতে তুলে দেওয়া হয়, সেটিও হবে আরেক ধরনের অন্যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে ক্রমবর্ধমান অপরাধের সূচক কমাতে অপরাধীদের কার্যকর ডেটাবেইসের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে পুলিশের খাতায় কারো নাম থাকা মানেই তিনি অপরাধী নন। তদন্তাধীন মামলা, অভিযোগ, খালাস, সাজা—সবকিছুকে এক করে প্রকাশ করলে নির্দোষ মানুষের সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতি হতে পারে। তাই এ বিষয়গুলো আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতেও দেখতে হবে।’