মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্স সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। ২২ আগস্ট এ পুলিশ বক্সের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল দৈনিক যুগান্তরে। সংবাদে পুলিশ বক্সসহ দীর্ঘ ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের কথা বলা হয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মেরিন ড্রাইভসহ বেড়িবাঁধও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই শঙ্কা সত্যি হতে চলেছে।
সোমবার উন্মত্ত সাগর ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সটি গিলে খেয়েছে। মেরিন ড্রাইভের সানসেট পয়েন্টেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিমে লেম্বুর বন পর্যন্ত থাকা সাগর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধরক্ষার সিসি ব্লক দেবে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এসব জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে কিছু বালির বস্তা ফেলা হলেও তাতে কতটা কাজ হবে-তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় বাঁধ ভেঙে সাগরের লোনা পানি কুয়াকাটার লোকালয়ে ঢুকে যেতে পারে।
জানা গেছে, বহু বছর ধরে সৈকত গিলে লোকালয়ের দিকে এগোচ্ছে কুয়াকাটার সমুদ্র। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহুবার সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পাশাপাশি দিনের পর দিন আন্দোলন করছেন ওই এলাকার মানুষ। সাগর ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর পক্ষ থেকে তিনটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছিল পরিকল্পনা কমিশনে। কিন্তু প্রতিবার নানা অজুহাতে সেগুলো ফেরত পাঠিয়েছে কমিশন। সর্বশেষ গত বছর ৭৫৯ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প কমিশনে জমা দিয়েছে পাউবো। ফেরত না পাঠালেও সেই প্রকল্পের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানে না কেউ। প্রতি বছর গ্রীষ্ম মৌসুমে অব্যাহতভাবে সৈকত গিলে মূল ভূ-খণ্ডের দিকে এগোচ্ছে সমুদ্র। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, হুমকির মুখে পড়েছে সাগররক্ষা বাঁধসহ নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ সড়ক। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়ছে বেড়িবাঁধে। জিরো পয়েন্টের পশ্চিম প্রান্তে থাকা ব্লকগুলোতেও আঘাত হানছে বড় ঢেউ। এতে করে স্থানচ্যুত হচ্ছে ব্লকগুলো। এটি বেড়িবাঁধের স্থায়িত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি।
ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর প্রেসিডেন্ট রুম্মন ইমতিয়াজ তুষার বলেন, জিরো পয়েন্টে বর্তমানে যেখানে বেড়িবাঁধ সেখান থেকে সমুদ্র ছিল আরও অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে। ভাটির সময় দীর্ঘ সৈকত পেরিয়ে সাগরে নামতে হতো পর্যটকদের। ৩০ থেকে ৩৫ বছরে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সেই সৈকত গিলে বেড়িবাঁধে এসে ঠেকেছে সমুদ্র। কুয়াকাটা উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সদস্য ফারুক মীর বলেন, দেড় কিলোমিটার বিস্তৃত এ সৈকত ছাড়াও বেড়িবাঁধের সামনে ছিল সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা। ছিল কয়েক বর্গকিলোমিটারব্যাপী ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, এলজিইডির বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট কাম রেস্ট হাউজ, সদ্য বিলীন হওয়া ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স, ইকোপার্ক, ঝাউবন, পূর্বপ্রান্তে সাগরঘেঁষা সড়ক, হোটেল-মোটেলসহ আরও অনেক কিছু।
স্থানীয় সংবাদকর্মী রাজু কেপিএস বলেন, সাগর ভাঙন ঠেকানো বলতে এখানে গ্রীষ্ম মৌসুমে কেবল বালির বস্তা ফেলে পাউবো। সৈকতজুড়ে চোখে পড়ে সেই হাজার হাজার বালির বস্তা। এ বস্তায় ঠেকে না সাগরভাঙন। এছাড়া সৌন্দর্য হারায় সমুদ্রসৈকত। ভাঙনের যে পরিস্থিতি তাতে বাকি আছে কেবল বেড়িবাঁধ ভেঙে জনবসতি এলাকায় সাগরের ঢুকে পড়া। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, ২৫-৩০ বছরের ব্যবধানে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি ছড়িয়েছে কুয়াকাটার। এখানে গড়ে উঠেছে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সবকিছুই এখন হুমকির মুখে। তিনি আরও বলেন, আপনারা যেমন নিয়মিত বিষয়টি নিয়ে লিখছেন, তেমনি আমরাও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের পাশাপাশি দফায় দফায় চিঠি লিখছি। তিনি বলেন, সাগর যেভাবে ভাঙছে তা ঠেকানো না গেলে এখানকার পুরো পর্যটনশিল্প হুমকির মুখে পড়বে। কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটায় ভাঙন প্রতিরোধ-সংক্রান্ত প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। টাকার পরিমাণ বেশি হওয়ায় হয়তো সেটি অনুমোদন পাচ্ছে না। কম ব্যয়সাপেক্ষ বিকল্প প্রকল্প প্রস্তুত করছি আমরা। এ প্রকল্পে ধাপে ধাপে সাগরভাঙন ঠেকানো যাবে। প্রস্তাবনা তৈরি হলেই দাখিল করা হবে। বাকি সিদ্ধান্ত সরকারের।
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ-সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসাবে জিও (বালিভর্তি বস্তা) ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য পাউবোর প্রকল্প অনুমোদনের কাজ চলছে। আশা করি খুব শিগ্গিরই সাগরভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ নিতে পারব আমরা।