যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর ভয়াবহ হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর। হামলার পর আফগানিস্তানে শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের দুই দশক পর তালেবানের প্রত্যাবর্তন দেশটিকে আবারও গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করেছিল, তার বড় অংশই শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে গেছে। বরং ২৫ বছর পর আফগানরা দারিদ্র্য, দমন-পীড়ন, অধিকারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে। এর পাশাপাশি দেশটিতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবছর ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো, ওয়াশিংটনের পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার সোমারসেট কাউন্টিতে ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পুষ্পস্তবক অর্পণ ও নানা আয়োজনে তাদের স্মরণ করেন মার্কিন নাগরিকেরা। কিন্তু ওই হামলার পরিণতিতে আফগানিস্তানের জন্য নেমে আসে দীর্ঘ যুদ্ধ ও অস্থিরতার এক বিভীষিকাময় অধ্যায়।
ওসামা বিন লাদেনকে ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। লাদেনকে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে হত্যা করা হলেও আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলেছে প্রায় দুই দশক। এতে হাজার হাজার আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। প্রাণ হারান শত শত মার্কিন সেনাও। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি দেশটির মানুষের জন্য উন্নত জীবন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার, আফগান প্রজাতন্ত্রের পতন এবং তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশার বড় অংশ ভেঙে পড়ে। দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা অনেক আফগানকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারলেও এখন অনেকেই দেশটির অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের কারণে বহিষ্কারের আশঙ্কায় রয়েছেন।
তবে মার্কিন দখল ও যুদ্ধের দুই দশককে শুধু ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করলে আফগানিস্তানের সেই সময়ের কিছু অর্জন আড়ালে পড়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উইলিয়াম মালিক এবং আফগান গবেষক ও আইনজীবী আহমদ সুজা জামাল তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন, আমেরিকান দখলে আফগানিস্তানে অনেক কিছুই ভুল হয়েছিল ঠিকই, তবে অনেক ভালো কাজও সম্পন্ন হয়েছিল।
তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগান তরুণদের একটি প্রজন্ম বিশ্বায়নের যুগে বেড়ে ওঠে। ২০২১ সাল নাগাদ দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ খবর ও তথ্য পাওয়ার জন্য টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করত। মাথাপিছু গড় আয়ও বেড়েছিল। তুলনামূলকভাবে মুক্ত গণমাধ্যমের সহায়তায় প্রাণবন্ত সুশীল সমাজ গড়ে উঠেছিল। স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হয়েছিল এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগও বিস্তৃত হয়েছিল। পশ্চিমা দাতাগোষ্ঠীগুলো অনেক সময় এসব অর্জনকে বাড়িয়ে তুলে ধরলেও সেগুলো বাস্তব ছিল এবং কোনোভাবেই নগণ্য ছিল না।
তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভুলও হয়েছিল। ২০০১ সাল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এর ফলে আফগান রাষ্ট্রব্যবস্থা অত্যধিক কেন্দ্রীভূত ও জটিল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এমন একটি নব্য স্বজনপোষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে বিপুল বৈদেশিক সহায়তার অর্থ যুক্ত হয়ে দুর্নীতিকে আরও উসকে দেয়। ২০০৯ সাল থেকে অনুষ্ঠিত কয়েকটি নির্বাচনও জালিয়াতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অথচ পশ্চিমা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন।
আফগান জাতীয় সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা ছিল। বাহিনীটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তারা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে। এর ফলে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণে তারা মার্কিন বেসামরিক ঠিকাদারদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ওই সহায়তা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাহিনীটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিও আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আক্রমণ শুরু করলে আফগানিস্তানে তাদের কার্যক্রমের গতি ও মনোযোগ অনেকটাই কমে যায়। অথচ সে সময়টি ছিল আফগানিস্তানের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সুযোগে পাকিস্তান আবারও আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ বাড়ানোর সুযোগ পায়। ১৯৯৪ সাল থেকেই তালেবানের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল পাকিস্তান। কাবুলে ভারতপন্থী সরকারের শক্ত অবস্থান ঠেকাতে ইসলামাবাদ তালেবানকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। কিন্তু এই হস্তক্ষেপ মোকাবিলার মতো সক্ষমতা আফগান প্রজাতন্ত্রের ছিল না।
পরপর কয়েকজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে ইসলামাবাদের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ হন। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক এ. মিলি সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানের বিষয়ে ‘কখনোই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াটা’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ভুল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় তালেবান সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ভুল হিসাব। আফগানিস্তানের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বছরের পর বছর ধরে সংঘটিত হামলা ও হতাহতের বড় অংশের জন্য তালেবান দায়ী থাকলেও ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র আফগান সরকারকে বাদ দিয়ে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে। ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ তালেবানের সঙ্গে সৈন্য প্রত্যাহারের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির মাধ্যমে তালেবানের সঙ্গে সমঝোতার পথ তৈরি হলেও এর ফল শেষ পর্যন্ত আফগান সরকারের জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ২০২১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার পূর্বসূরির দেখানো পথ অনুসরণ করে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। আগস্টে আফগান সরকারের পতন ঘটে এবং তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
তালেবান ক্ষমতায় ফিরে নিজেদের সংস্কারপন্থী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও তাদের শাসনে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি। আফগানিস্তানে এখন কোনো কার্যকর সংবিধান নেই এবং তালেবান প্রকাশ্যেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে। দেশটি কার্যত কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
তালেবান নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা একের পর এক দমনমূলক ফরমান জারি করছেন। আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছে। নারীদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যমূলক নীতিকে অনেকেই ‘লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ’ বা ‘লিঙ্গবৈষম্যমূলক পৃথকীকরণ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
ক্ষমতার বৈধতার কোনো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না থাকায় তালেবান সরকার টিকে থাকার জন্য বলপ্রয়োগমূলক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনও তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। এতে রাশিয়া যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে উপহাসের সুযোগ পেয়েছে, তেমনি ছয় মাস পর ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হামাসও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহারকে নিজেদের জন্য অনুপ্রেরণার ঘটনা হিসেবে দেখেছিল।
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা হলো দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির মূল্য কতটা। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাটো-সদস্য নয় এমন মিত্র’ হিসেবে আফগানিস্তানের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা কখনো কখনো আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিরও সীমা হয়ে উঠতে পারে, আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা তারই উদাহরণ।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা। ২০০১ সালে তালেবানের প্রথম শাসনের পতনের অন্যতম কারণ ছিল ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়া। কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপিত বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আফগানিস্তান এখনো বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার। নির্বাসনে থাকা আফগান বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘হামরাহ নেটওয়ার্ক’-এর একটি গবেষণায় এসব মাদ্রাসা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ৩৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে আফগানিস্তানসহ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফলে ৯/১১-এর ২৫ বছর পর আফগানিস্তানের সামনে প্রশ্ন শুধু অতীতের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ যুদ্ধ, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও তালেবান শাসনের পর দেশটি কোন পথে এগোবে। আজকের আফগানিস্তানে বিস্তৃত ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তারকে অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যতের ‘টাইম বোমা’ হিসেবে দেখছেন।
দ্য কনভারসেশন সাময়িকী থেকে সংগৃহীত, অনূদিত ও সম্পাদিত