মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও কার্যকরের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যপ্রণালি (বিধি) সংশোধন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে প্রসিকিউশন। কার্যপ্রণালি সংশোধনের পরই পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ অন্য দণ্ডিত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জুলাই শহীদদের পরিবারের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যপ্রণালি সংশোধন করতে হবে। কোন প্রক্রিয়ায় সম্পদ আদায় হবে, তার সংশোধনী নেই। এটা লাগবে। এ লক্ষ্যে আমরা একটি সেমিনার করব। ট্রাইব্যুনালকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেব। ট্রাইব্যুনালই কার্যপ্রণালি সংশোধন করবেন। এর আগে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়নি বলে জানান তিনি।
ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ আছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায়, কোন সংস্থার মাধ্যমে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে-আইনে তার কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। এজন্য গুরুত্ব বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল একটা বিধি করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায়ে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ অনেক দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যান্য মামলার রায় হলেও আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় দণ্ডিত আসামির সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তা কীভাবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাছে ১২ আগস্ট নির্দেশনা চান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বিচারককে বলেন, ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালিতেও এ বিষয়ে উল্লেখ নেই। ফলে দণ্ডিত আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলেও তা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আপনারা এ ব্যাপারে কাজ করতে পারেন। চিফ প্রসিকিউটরেরও এখানে দায়িত্ব আছে। ট্রাইব্যুনাল-১, ট্রাইব্যুনাল-২ এবং চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় বসে সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বণ্টনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যপ্রণালি ঠিক করতে পারে। তখন চিফ প্রসিকিউটর জানান, তারা ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১-এর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
এর আগে ৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পর তা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ শহীদদের পরিবারের মধ্যে বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। এ ধরনের কোনো নজির ট্রাইব্যুনালে নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এবার প্রথমবার এ প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে প্রসিকিউশন।
জুলাই শহীদদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে নির্দেশ : ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। রায়ে জুলাই শহীদদের ‘কনসিডারেবল অ্যামাউন্ট অব কম্পেনসেশন’ (উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ) দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রায়ের কপি দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের যে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ হয় : আদালতের রায়ের পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ কত, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ‘আমি-ডামি নির্বাচন’ নামে পরিচিত ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসাবে শেখ হাসিনা (গোপালগঞ্জ-৩) ও আসাদুজ্জামান খান কামাল (ঢাকা-১২) যে হলফনামা জমা দিয়েছিলেন, সেই সূত্র থেকে তাদের ঘোষিত সম্পদের কিছু তথ্য জানা যায়। হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন। যদিও এর বাইরে শেখ হাসিনার বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে মর্মে অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ-সদস্য হয়েছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যে হলফনামা দিয়েছিলেন, সেই সূত্র থেকে ঘোষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাতে আসাদুজ্জামান খান হাতে নগদ দেখিয়েছিলেন ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা দেখান ৮২ লাখ টাকার মতো। বন্ড ও শেয়ার প্রায় ২৪ লাখ টাকা। ডাকঘর, সঞ্চয়পত্র অথবা স্থায়ী আমানত দেখিয়েছিলেন ২ কোটি ১ লাখ টাকা। এর বাইরেও আসাদুজ্জামান খানের অপ্রদর্শিত বিপুল পরিমাণ সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুদক।
কার্যপ্রণালি সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী যুগান্তরকে বলেন, আমরা বিচারাধীন মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে আদালতের কাছে আবেদন করেছি যেন এর ওপর আদালত দিকনির্দেশনা দেন। অর্থাৎ, আদালতে যদি কোনো আসামির অপরাধ প্রমাণ হয় এবং সেই রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন, সেক্ষেত্রে সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত হবে-তার প্রক্রিয়াটাও আদেশে বিস্তারিত যেন বলা হয়। এর জন্য আবেদন করা হয়েছে।