মাদক কারবারের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৩০ আগস্ট রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগ ও মুন্সিরটেক এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এলোপাতাড়ি গুলিতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এর আগের দিন শনিবার ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান স্কুল শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। চোখের চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষিকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুটি ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির রূপ সামনে এনেছে। এভাবে দিনকে দিন রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখল এবং কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ংকর তৎপরতা জনজীবনকে এক প্রকার অতিষ্ঠ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ স্বস্তি রোধ করছেন না। অনেকে আছেন নিরাপত্তাহীনতায়। চাঁদাবাজির ঘটনা যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটপাতের দোকান থেকে ছোট বড় ব্যবসায়ী, আবাসন প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট অফিসগুলোও এখন চাঁদাবাজদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধাবাদী চক্রের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নানা সিন্ডিকেট এসব অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেফতার করলেও জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদাবাজদের কারণে মানুষের মনে অস্বস্তি থাকলেও পুলিশ সদর দপ্তরে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বা আসামিদের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণ করে এর আগের ছয় মাসের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী হিসাবে দেখা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত চলতি বছরের সর্বশেষ ছয় মাসের (ফেব্রুয়ারি-জুলাই) অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন অপরাধে সারা দেশের থানাগুলোতে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে প্রায় এক লাখ (৯৯ হাজার ৯৯২)। এর মধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে এক হাজার ৭৯১টি। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, প্রতিমাসে গড়ে মামলা হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬৫ দশমিক ৩৩টি। দিনের হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে মামলা হয়েছে ৯২ দশমিক ৫৮টি।
অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এ অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে ৪০৮টি, ডাকাতির মামলা ২৬৫টি, ৯০৪টি ছিনতাইয়ের মামলা, অপহরণের মামলা ৫১২টি, চার হাজার ৮০৮ চুরির মামলা, এক হাজার ৫৯১ সিঁধেল চুরি ও অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ আক্রান্তের ঘটনায় ৩১৬টি, দাঙ্গার ঘটনায় ১৩টি এবং উদ্ধারসংক্রান্ত (অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান এবং বিস্ফোরক) ঘটনায় ৩৬ হাজার ২৯৮টি মামলা হয়েছে।
এর আগের বছর (২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) মোট মামলা রেকর্ড হয়েছে ৮৯ হাজার ১২টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ছিল এক হাজার ৭৮০টি। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে দ্রুত বিচার আইনে ৪৬০টি, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ১০ হাজার ৯০টি, ডাকাতির মামলা ৩২৮টি, ছিনতাই মামলা ৯৬০টি, অপহরণ ৫৬৩টি, পাঁচ হাজার ১৩ চুরির মামলা, এক হাজার ৬৫৯ সিঁধেল চুরি ও অন্যান্য ঘটনায় ৩৮ হাজার ২৪৯টি মামলা হয়েছে। ওই সময় পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ২৮৫টি। দাঙ্গার ঘটনায় মামলায় হয় ১০টি। উদ্ধার সংক্রান্ত (অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান এবং বিস্ফোরক) ঘটনায় ২৯ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে।
ঢাকার আইনশৃঙ্খলা : এদিকে শুধু রাজধানীর দিকে নজর দিলেও অপরাধপ্রবণতা ও মামলার ঊর্ধ্বমুখী তথ্য মেলে। ডিএমপি থেকে প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) বিভিন্ন অপরাধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে আট হাজার ৪৪টি। এর মধ্যে খুনের মামলা ১২৭টি। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে ডাকাতির ঘটনায় ১৮টি, দ্রুত বিচার আইনে ২৯, দস্যুতার ঘটনায় ১৩১, নারী ও শিশু নির্যাতেনের ঘটনায় ৭৭৮টি (ধর্ষণ ৩২৮) মামলা হয়েছে। অপহরণের মামলা হয়েছে ৯৪টি। সিঁধেল চুরির ঘটনায় ২৬২, গাড়ি চুরির ঘটনায় ২২৪ ও অন্যান্য চুরির অভিযোগে ৩৫০টি মামলা হয়েছে। উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে তিন হাজার ২৭টি। এর মধ্যে অস্ত্র মামলা ৮৪, বিস্ফোরক ১৩, চোরাচালান ৬৯ ও মাদক মামলা দুই হাজার ৭৬২টি। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৩টি ও অন্যান্য ঘটনায় দুই হাজার ৮৩২টি মামলা হয়েছে।
অপরদিকে এর আগের ছয় মাসে (২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) বিভিন্ন ঘটনায় ডিএমপিতে মামলা হয়েছে আট হাজার ৬৬৫টি। এর মধ্যে খুনের মামলা ১৪৭টি। দস্যুতার মামলা ১৯৬টি। ডাকাতির ঘটনায় ১৬টি, দ্রুত বিচার আইনের ৫৯, নারী ও শিশু নির্যাতনেও ঘটনায় ৮১৭ (ধর্ষণ ৩১৭) মামলা হয়েছে। সিঁধেল চুরির ঘটনা ঘটেছে ২৬৯টি। গাড়ি চুরির ঘটনায় ১৮৩ ও অন্যান্য চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৮৭টি। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি। উদ্ধারজনিতে মামলা হয়েছে তিন হাজার ৩২৬টি। এর মধ্যে অস্ত্র সংক্রান্ত ১০৯, বিস্ফোরক সংক্রান্ত ৮৬, চোরাচালানের ৭০ ও মাদকের তিন হাজার ৬১টি মামলা আছে। এছাড়া অন্যান্য মামলা হয়েছে তিন হাজার ১৭টি।
চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে : অপরাধের তথ্যে আরও দেখা যায়, চাঁদাবাজরা বিভিন্ন দূতাবাস বা হাইকমিশনে চাঁদা চেয়ে ই-মেইলও পাঠাচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, গত ১৭ ও ১৯ আগস্ট চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অন্তত চারটি বিদেশি দূতাবাস এবং কয়েকটি সরকারি দপ্তরে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর নেপথ্যে একটি অপরাধী চক্র কাজ করছে। এটি নিছক সাধারণ চাঁদাবাজি নয়; বরং বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসগুলোর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি গভীর দেশবিরোধী অপতৎপরতা। এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ টিম নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিফুল ইসলাম। তিনি জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে কূটনৈতিক পাড়ার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন কাঁচাবাজার, পরিবহণ খাত এবং নির্মাণাধীন ভবনে প্রকাশ্যেই চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে শারীরিক নির্যাতন বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যের জমি, প্লট, মার্কেট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পুরান ঢাকার সদরঘাটে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে গত ১৫ আগস্ট সূত্রাপুরের ইস্ট বেঙ্গল সুপার মার্কেটে সংঘর্ষ হয়। এতে একজন নিহত হন। আগস্টের শুরুতে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবিতে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১১ তলা ভবনের গেট লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা এলাকায় বালু সরবরাহ ও ঠিকাদারি কাজের ওপর প্রভাব বিস্তার কেন্দ্র করে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত ২৫ আগস্ট রাতে স্থানীয় ঠিকাদারের প্রায় এক কিলোমিটার বালু পরিবহণের পাইপ ভেঙে ফেলা হয়, যাতে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি হয়। পরে ভুক্তভোগী ঠিকাদারের দায়ের করা চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের মামলায় ৩০ আগস্ট পুলিশ অভিযান চালিয়ে কদমতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাম শেখসহ চারজনকে গ্রেফতার করে।
অপরাধ বৃদ্ধির এই বাস্তবতা সামনে রেখে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধ দমনে তৎপরতা সরকার বাড়িয়েছে বলে জানান দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
পুলিশ যা বলছে : অপরাধ বৃদ্ধি ঠেকাতে পুলিশ কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এমন প্রশ্নে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ ওসসমান গণি যুগান্তকে বলেন, আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত : আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আদালতে সোপর্দের পর আসামিরা বেরিয়ে এসে একই কাজে জড়িত হচ্ছে। মাদক এবং অর্থনৈতিক কারণেই মানুষ বেশি অপরাধে জড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাঞ্চল্যকর ৯৫ ভাগ ঘটনার রহস্য আমরা উদ্ঘাটন করেছি। অপরাধীরা যাতে দ্রুত জামিন না পায়, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রতিটি ঘটনায় আমরা জামিনের বিরোধিতা করছি।
ডিএমপির কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। সাদা পুলিশে ডিবি এবং সিটিটিসি ইউনিটের বেশ কয়েকটি টিম সক্রিয় আছে। রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কাজ করছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংকে জিরো (শূন্য) করার ঘোষণা দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে র্যাবও। আমরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করব যাতে, ভবিষ্যতে কিশোর গ্যাং নামে কোনো গ্যাংয়ের নাম থাকবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি : সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন অহমদ কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদককারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা যদি অপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করে বা নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দেন, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও সারা দেশের সব ইউনিটকে চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।