Image description

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় মাস পার হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য অনেকটাই দৃশ্যমান। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নসহ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিরোধী দলগুলো রাজপথে নেমেছে। বিপরীতে সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ও বিরোধী দলের এমন অবস্থান কাম্য নয়। তারা চাইলে এমন পরিস্থিতি ঠেকানো যেত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সরকার ও বিরোধী দল চাইলে এমন পরিস্থিতি ঠেকানো যেত। তিনি বলেন, সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের স্বাভাবিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাদের গঠনমূলক প্রস্তাবও থাকতে হবে। বিরোধী দলের আন্দোলন ও সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ হলেও তা যেন সংসদ বর্জন, হানাহানি বা সহিংসতায় রূপ না নেয়-সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ক্ষমতার লড়াই বা পরিবর্তন-যাই হোক না কেন, এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়ন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা যেন জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বড় করে না দেখে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ সব সময় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। তবে সরকার ও বিরোধী দলের বর্তমান পরিস্থিতি কারোরই কাম্য নয়।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সংসদের মাত্র দুটি অধিবেশন শেষ হয়েছে এবং তৃতীয় অধিবেশন চলমান। কিন্তু সংসদে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার বদলে বিরোধী দলের আন্দোলন গড়িয়েছে রাজপথে। শনিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করেছে। দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম একধাপ এগিয়ে বলেছেন, ছয় দফা দাবি না মানলে এক দফা হতে সময় লাগবে না। রাজনৈতিক পরিভাষায় এক দফা হলো সরকার পতনের আন্দোলন। বিরোধী দলের ছয় দফার মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; চাদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং দলীয়করণ বন্ধের দাবি রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এগুলোর মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকলেও বাকিগুলোর বিষয়ে সরকারের দ্বিমত নেই। কিছু ক্ষেত্রে সক্ষমতার প্রশ্ন থাকতে পারে। এজন্য সরকারকে সময় দেওয়া উচিত বলেও তারা মনে করেন। তাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অপরাধীদের বিচার না হলে সরকারেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনো সরকারেরই কাম্য নয়। কিন্তু সরকার বেশি চাপে পড়লে অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তি এর সুযোগ নেবে বলে তারা মনে করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর ঐক্য ধরে রাখা। কিন্তু নতুন সরকারের যাত্রার মাত্র ছয় মাসের মাথায় পরিস্থিতি উলটোদিকে মোড় নিয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে দেশে রাজনীতিতে আলোচনা ছড়িয়েছে।

মূলত সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রথমে রাজনৈতিক বিরোধ শুরু হয়। বিএনপি বলছে, তারা সংবিধান সংশোধন করবে। এজন্য ইতোমধ্যে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিতে বিরোধী দলের কাছেও নাম আহ্বান করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি। এ প্রশ্নে জামায়াত ও এনসিপি বলছে, সংশোধন নয়; গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এই দাবিতে সংসদের পাশাপাশি তারা রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে। এদিকে এ বিভাজনের মধ্যে সংসদের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে সভাপতির পদ না দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী দল। তবে এ কর্মসূচিতে বিরোধী দলের নেতাদের কঠোর বক্তব্যে পালটা জবাব দিয়েছেন সরকারি দলের নেতারাও। ফলে সংসদ ও রাজপথ-দুই জায়গায়ই তাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। বিরোধী দল বলছে, তাদের দাবি উপেক্ষা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, বিরোধীরা দায়িত্বশীল আচরণ না করে আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শনিবার বলেছেন, দেশের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আইনে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে। তবে তিনি জানান, বিরোধী দলের আন্দোলন সরকারকে বিদায় করার জন্য নয়। কেউ যদি বিদায় নেওয়ার আমল করে, তখন তাদের কী করার আছে!

দেশে অব্যাহত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতির পাশাপাশি জনজীবনের নানা সংকট সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জেও রয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ছয় মাসের মাথায় রাজপথে আন্দোলন সরকারের জন্য বাড়তি চাপ হিসাবে যোগ হয়েছে। বলা হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর প্রকাশ্য বিভক্তি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক ‘স্পেস’ তৈরি করছে। জুলাইয়ের শক্তিগুলোর মধ্যে এই বিরোধ বা সংঘাতের আশঙ্কা যত বাড়বে, আওয়ামী লীগের জন্য সুযোগও ততটাই বাড়বে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, সংসদে কার্যকর ভূমিকা না রেখে মাত্র ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দল রাজপথে ‘লংমার্চ’-এর নামে গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অশ্রাব্য ও আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীও এসব কর্মকাণ্ডের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। রিজভী আহমেদ বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীরা শুধু সমালোচনা করছে; সংকট সমাধানে গঠনমূলক কোনো প্রস্তাব দিচ্ছে না। সংসদে পরামর্শ না দিয়ে তারা বাইরে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধির মতো ইতিবাচক অর্জনগুলোও তারা জনগণের সামনে তুলে ধরছে না।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংসদে আছি। তারপরও বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে। কারণ, আমাদের প্রথম দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য সংসদে আমরা বহু চেষ্টা করেছি। ৬৮ বিধিতে নোটিশ করেছি। ওনারা মানবেন না। ওনারা সংস্কার করবেন না।’ তিনি বলেন, আন্দোলনের নিয়মতান্ত্রিক দুটি জায়গা-একটি সংসদ, অন্যটি রাজপথ। আমাদের আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ হবে। সংসদের ভেতর ও বাইরে উভয় জায়গায় দাবি আদায়ের কর্মসূচি চলবে। লংমার্চ ছিল সেই কর্মসূচিরই একটি অংশ। সামনে আরও কর্মসূচি আসবে বলেও জানান তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ৬ মাসে সরকার সর্বক্ষেত্রে চরম ব্যর্থ হয়েছে। দিন যত যাচ্ছে, সরকারের ব্যর্থতা আরও তীব্র হচ্ছে। আমরা লংমার্চ করছি সাধারণ মানুষের হয়ে। সাধারণ মানুষ লংমার্চে আসছে, সরকারের বিরুদ্ধে তারা কথা বলছে, প্রতিবাদ করছে। সংসদে যদি বিষয়গুলো সুরাহা হতো, তাহলে লংমার্চ করতে হতো না। রাজপথে আসতে হতো না। সংসদে কিছুই সুরাহা না হওয়ায় আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের পথে হাঁটছি।

এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের আকাঙ্ক্ষা পূরণে টালবাহানা করছে। অধিকাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে মত দিলেও এখন সেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। আমাদের দাবিগুলোকে সরকার হালকাভাবে দেখলে এবং জনতার লংমার্চ ও ক্ষোভকে বুঝতে না পারলে আন্দোলন এক দফায় রূপ নেবে।

অবশ্য এখনই এক দফাকে রাজনৈতিক বক্তব্য বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দল একসময় একই রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশীদার ছিল। তাদের অতীত সম্পর্কের কারণে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করবে। কিন্তু বর্তমানে তাদের ভূমিকা বদলে গেছে। একে অপরের সমালোচনা ও দোষারোপই যেন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির অবসান ঘটিয়ে সম্প্রীতির রাজনীতিতে ফিরতে না পারলে সংকট থেকেই যাবে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের জন্যও সুযোগ তৈরি হবে।