Image description

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ চারপাশের এলাকায় ঘনঘন ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ডিবি ও র‌্যাব পরিচয়ে টার্গেট ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে অপরাধীচক্রটি। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একই এলাকায় ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়িত রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামে এক ভয়ংকর অপরাধী। যার বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি চাঁদাবাজিসহ ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে অসংখ্য মামলা রয়েছে। বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনার পর অন্যের বোর্ডিং পাশ ব্যবহার করে দেশ ছাড়ার রেকর্ডও রয়েছে তার। এমন এক দুর্ধর্ষ ডাকাতের নেতৃত্বে গড়ে তোলা চক্রটির অপরাধ-তাণ্ডব দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। চক্রটি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গেও যুক্ত বলে তথ্য মিলেছে। ভুক্তভোগীরা তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অভিযোগ করে উলটো হয়রানির মুখে পড়তে পারেন, সেই শঙ্কায় অনেকে ঘটনা চেপে যান। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ডাকাত রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে কোনো কোনো প্রভাবশালী নেতার কাছের মানুষ হিসাবে প্রচার করছেন। ফলে তাকে গ্রেফতারে পুলিশের রয়েছে অনীহা। একজন ভুক্তভোগী বলেন, বিমানবন্দরে বিদেশফেরত যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ না করলে বিষয়টি প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানাব।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ডালিমের অপরাধীচক্রটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় ওত পেতে থাকে। প্রবাস থেকে দেশে ফেরা যাত্রীসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের ওপরও নজরদারি চালিয়ে তাদের অর্থকড়ি লুটে নেয়। বিদেশ থেকে শখে অনেকেই কিছু স্বর্ণ, দামি ঘড়ি, মোবাইল বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে এসবের কাগজপত্র থাকে না। ডাকাতচক্র তাদের টাকা-ডলার ছাড়াও সেই স্বর্ণালংকার লুটে নেয়। এ ঘটনায় কেউ অভিযোগ দিতে যায় না। ফলে চক্রটি সবদিক থেকেই বিদেশফেরত যাত্রীদের জিম্মি করে দিনের পর দিন অপরাধকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

২৩ জুলাই চক্রটি বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় মোহাম্মদ রিয়াজ নামের এক ব্যবসায়ীর ১৫ লাখ টাকা লুটে নেয়। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে রিয়াজ ও তার সঙ্গে থাকা আজমীর হোসেনকে গাড়িতে তুলে বেধড়ক মারধর করে ডাকাতদলটি। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় হওয়া মামলায় ডালিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাসেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মো. আলী নামে চক্রের আরেক ডাকাত সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ১৫ লাখ টাকা।

জানা যায়, ওই মামলার তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ডালিমের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ছয়টি ডাকাতি ও হত্যা মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাকে গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তৎপরতা কেন নেই, এর সদুত্তর কেউ দিতে পারছে না। গত বছরের ২০ জানুয়ারি বিমানবন্দর সড়কে পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতের কবলে পড়েন দুবাইফেরত প্রবাসী সনজিৎ ও তার পরিবার। ভোর ৫টার দিকে ফরিদপুরের উদ্দেশে রওয়ানা হলে র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলের সামনে পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তি সিগন্যাল লাইট দিয়ে তাদের গাড়ি থামায়। এ সময় ৭-৮ জনের একটি দল সড়কে ভুয়া নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র ও টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ডাকাতদের হামলায় প্রবাসীর গাড়ির কাচ ভেঙে যায় এবং এক নারী আহত হন। এমন আরও ঘটনা ঘটলেও মামলার ঝামেলায় যান না অনেকে।

পুলিশ বলছে, বিমানবন্দর এলাকায় ডাকাতি ঠেকাতে যে পরিমাণ টহল দরকার, যানবাহনের ঘাটতির কারণে তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবির বলেন, ‘উত্তরা বিভাগের আওতাধীন এলাকা অনেক বড়। বিমানবন্দর এলাকার ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ বন্ধে প্রতিনিয়তই পদক্ষেপ নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের যানবাহনের স্বল্পতা রয়েছে।’ তিনি জানান, ডিবির পরিচয়ে অপরাধীরা এ ধরনের অপরাধ করলেও ডিবি জড়িত নয়; ডাকাতদলের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে থাকে। আকিজ গ্রুপের একজন ডিলার ভুক্তভোগী মোহাম্মদ রিয়াজ। রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন প্রেমবাগানে তার অফিস। সেখান থেকে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মালামাল সরবরাহ করেন তিনি। ২৩ জুলাই রিয়াজ ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার আজমীর হোসেন প্রাইভেটকারে উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দক্ষিণখানের উদ্দেশে রওয়ানা হন। রাত ৮টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ২ নম্বর সেক্টরের ব্রিজের ওপর গাড়ি থামিয়ে চা খেতে যান। পরবর্তী সময়ে গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করার সময় দেখতে পান দুটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলে করে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু লোক হাজির। তারা ডিবি পরিচয়ে রিয়াজ ও আজমীরকে হাতকড়া পরিয়ে জোরপূর্বক নিজেদের গাড়িতে তুলে নেন। টাকা লুটে নেওয়ার পর রাত ১টার দিকে রিয়াজকে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এবং আজমীরকে খিলক্ষেতের ৩০০ ফিট এলাকায় রেখে পালিয়ে যান ডাকাতরা। ভুক্তভোগী রিয়াজ বলেন, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের গাড়িতে তুলে বেধড়ক মারধর করে। টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়।’

এ মামলার তদন্তে প্রযুক্তিগত সহায়তায় দুর্ধর্ষ ডাকাত ডালিমের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। তদন্তসূত্র জানায়, বড় কোনো ডাকাতির পর অভিনব কৌশলে অন্যের বোর্ডিং পাশ ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়েন দুর্ধর্ষ ডাকাত ডালিম। কিছুদিন দুবাইয়ে আত্মগোপনে থেকে আবার দেশে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন। নিজের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী এক অপরাধী নেটওয়ার্ক।

ডালিমের অপরাধের ইতিহাস : রতন চৌধুরী ওরফে ডালিমের পিতা খলিল প্রধানিয়া ওরফে আমজাদ, বাড়ি চাঁদপুরের হাইমচরে। ২০১৬ সালে বনানী থানার একটি ডাকাতি মামলার (মামলা নং-০৩(০৬)২০১৫; ধারা- ৩৯৫/৩৯৭ দণ্ডবিধি) চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি। এছাড়া তেজগাঁও থানায় ২০১৬ সালের স্বর্ণালংকার ও ১৭ লাখ টাকা ডাকাতির মামলা, ২০১৪ সালের শেরেবাংলা নগর থানার মাওলানা ফারুকী হত্যা মামলা এবং ২০১৫ সালের বাড্ডা থানার পীর খিজির হত্যা মামলারও চার্জশিটভুক্ত আসামি। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ঢাকায় চলে আসেন ডালিম। শুরুতে মিরপুর মাজার ও ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতি করতেন।

২০০৬ সালে প্রথম গ্রেফতার হয়ে পাঁচ বছর জেল খাটেন। ২০১১ সালে জামিনে বের হয়ে জেলখানায় পরিচয় হওয়া ভয়ংকর অপরাধীদের নিয়ে নিজস্ব দল গঠন করেন এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নেন। ২০১৭ সালে পুনরায় গ্রেফতারের পর ২০১৮ সালে জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৪ সালের ১৬ মার্চ ডালিমের ভাগিনা কামাল হোসেন ৪০টি স্বর্ণের বারসহ বিমানবন্দর এপিবিএন ও এনএসআই-এর হাতে আটক হন। সেই স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গেও ডালিম জড়িত ছিলেন। তার অন্যতম সহযোগী রাসেলের বিরুদ্ধেও দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডালিম আবারও সক্রিয় হন। সমাজের অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে টার্গেট করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গেও ডালিমের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।