Image description

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সব ধরনের পরীক্ষায়ই চলে নকলের মহোৎসব। অনেক কেন্দ্রে শিক্ষকদের সামনেই বই খুলে পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা।

আবার কোথাও কিছুটা রাখঢাক রেখে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে নকল চলে। অনেক জায়গায় শিক্ষকরা গাইড থেকে নকল খুঁজে বের করতেও সহায়তা করেন। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রের শিক্ষকরা দেখেও না দেখার ভান করেন। এভাবে ভালো গ্রেড পেয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে পরীক্ষার্থীরা।
 
শিক্ষার্থীদের সাফল্যে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও বাহবা কুড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সেখানে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে পাঠদান করানো হয়। তারা ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়। প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ে তাদের একাধিক কেন্দ্র রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমেই অবাধে নকলে সহযোগিতা করা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, পরীক্ষাকেন্দ্র এবং আঞ্চলিক কেন্দ্র বা উপকেন্দ্রের মধ্যে এই সমঝোতা হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীকে দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। পরীক্ষাপ্রতি শিক্ষকদের ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। বিশেষ করে ইংরেজিসহ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোতে বেশি টাকা দিতে হয়।

সব ধরনের পরীক্ষার ক্ষেত্রে চলে এই লেনদেন, যা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের শিক্ষক ও আঞ্চলিক কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। এ জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটেও দুর্ভেদ্য পাহারা বসান শিক্ষকরা। যদি সেই পাহারা ঠেলে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারেন, তাহলে নকলের মহোৎসব দেখা যায়। যুগ যুগ ধরে এভাবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল চললেও বড় ধরনের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন উপাচার্য নকলের পুনরাবৃত্তি না ঘটার আশ্বাস দিয়েছেন।

বিভিন্ন মাধ্যমে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) অধীনে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বই দেখে লেখার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। গত শুক্রবারের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে বই দেখে লিখছেন। ওই কক্ষের প্রায় ৩০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই বই দেখে লিখছেন। দুজন শিক্ষক তাঁদের গার্ড দিচ্ছেন, তাঁরা ঘোরাঘুরি করছেন, কিন্তু কিছুই বলছেন না।

পরে আরেকজন শিক্ষক ওই কক্ষে আসেন। পরীক্ষাকেন্দ্রে সাংবাদিকরা ওই শিক্ষককে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আপনি কি অনিয়ম দূর করতে পারবেন বাংলাদেশে? এ দেশে থাকেন না আপনি? এ দেশের এরা দেখেই লিখবে। এরা দশ-বিশ বছর ধরে বই দেখেই লিখছে।’

ওই শিক্ষকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি ধমক দিয়ে বলেন, ‘আমার পরিচয় দেব না, আপনি কী করবেন, আপনি যান। আপনি আমার কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার কে?’ 

বিষয়টি নজরে আসার পর পরীক্ষার সময় নকলের সঙ্গে জড়িত চার পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই শিক্ষককে পরীক্ষাসংক্রান্ত সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে নকল প্রতিরোধে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। এবার তিনি পূর্ণ শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েও নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এমনকি সাধারণ শিক্ষায় তিনি সফলও হন। তবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উন্মুক্ত নকল প্রকাশ্যে আসায় আবার ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, যা ভাবিয়ে তুলছে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। 

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিগ্রি পরীক্ষায় গত শুক্রবার যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, এ জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত, লজ্জিত। ২৮৭টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষায় দুই লাখ ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়সভা করেছি। তাদের সহযোগিতায় আমাদের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো এই পরীক্ষা নিচ্ছে। তবে গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজ প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। সেখানে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটার পরই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। দফায় দফায় বৈঠক করেছি। উপ-উপাচার্যকে (একাডেমিক) আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি করেছি। ওই কলেজের কেন্দ্র বাতিল করেছি। আগামী দিনে উপজেলা সদর ছাড়া অন্য কোথাও কেন্দ্র না করার ব্যাপারেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র, চাকরিজীবী বা যাদের পড়াশোনায় গ্যাপ আছে, তারা পড়াশোনা করে। তাদের অনেকেরই ধারণা এখানে যেনতেনভাবে পরীক্ষা দেওয়া যাবে। আমি অতি সম্প্রতি উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েছি। এ ঘটনায় আমরা অ্যালার্ট হলাম। ভবিষ্যতে যাতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নকলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা আমরা নেব। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আর ডিগ্রি দেবে না, এখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করে নিতে হবে।’

গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের বিএ ও বিএসএস পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ডিএন ডিগ্রি কলেজ পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রকাশ্যে নকলের ঘটনা ঘটে। শিক্ষকরা দাঁড়িয়ে থেকে উন্মুক্ত নকল করার সুযোগ করে দেন। তখনো কারো সামনে ছিল বইয়ের ছেঁড়া পাতা, কারো সামনে পুরো বই খোলা। তা দেখে উত্তরপত্রে লেখেন পরীক্ষার্থীরা।

তখন পীরগঞ্জ ডিএন ডিগ্রি কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্র বাতিল করা হয়। এ ছাড়া বাউবির ঠাকুরগাঁও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রের যুগ্ম পরিচালককে দায়িত্বে অবহেলা ও নকল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

জানা যায়, যখন নকলের কোনো একটি কেন্দ্রের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, তখনো ওই কেন্দ্রে কিছু লোক-দেখানো ব্যবস্থা গ্রহণ করে দায়িত্ব শেষ করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও কিছুদিন পর তা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু পড়ালেখার মানের কোনো উন্নয়ন ঘটানো হয় না। সব কেন্দ্রে কঠোর নজরদারি করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ধারণা নিয়ে ভর্তি হয়, এখানে ভর্তি হলে নকল করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। কোনো পড়ালেখা করতে হবে না।

জানা যায়, গত ১৭ বছর পড়ালেখার মানের চেয়ে পাসের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষায়ও হু হু করে পাসের হার বেড়েছে, বেড়েছে জিপিএ ৫-এর সংখ্যা। একই অবস্থা ছিল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। নকল ছিল সেখানে ওপেন সিক্রেট। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি অলিখিত নির্দেশনা ছিল নকলে বাধা না দেওয়ার। ফলে অসাধু শিক্ষকরা এসব পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে নকলে সহযোগিতা করতেন। ফলে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নকলের কারখানায় পরিণত হয়েছে। আর কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, যা গত ১৭ বছরের মতো এখনো অব্যাহত। নকল দূর করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রোগ্রামে স্বাভাবিক পড়ালেখা ফিরিয়ে আনা নতুন প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।