Image description

সারা দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৬শ বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া কোর্ট সৃজন হলেও বিচারকের পদ সৃজন হয়নি—এমন সংখ্যা প্রায় ১৪শ। সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার বিচারকের বিচার বিভাগে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। সারা দেশের মামলা জটের প্রেক্ষাপটে এসব বিচারকের নিয়োগও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু শূন্য পদ পূরণ ও কোর্ট সৃজনের কাজেই গতি নেই। গতি নেই বিচারকদের বদলি-পদোন্নতি-শৃঙ্খলা বিধানের কার্যক্রমেও। এরই মধ্যে বিচারকদের বদলি-পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিধানসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ফাইল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভা ও জিএ (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কমিটির বৈঠকে এসব ফাইল নিষ্পত্তি হয়নি। আবার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করছেন প্রায় তিনশ বিচারক। বিচারক নিয়োগের পর এ ধরনের প্রশিক্ষণ জরুরি হলেও তা করা হয়নি। পদোন্নতির পর রিফ্রেসার্স ট্রেনিংও হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে বিচার প্রশাসনের কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত আট মাসে একটি ফুল কোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই ফুল কোর্ট সভায় অধস্তন আদালতের ছুটি ও এ-সংক্রান্ত ক্যালেন্ডার অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু গত ডিসেম্বরে প্রায় একশ বিচারকের সিভিল জজ থেকে সিনিয়র সিভিল জজ পদে পদোন্নতির প্রস্তাব সংবলিত একটি ফাইল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। আবার বেশ কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত ফাইল জমা পড়েছে। এসব ফাইল ফুল কোর্ট সভায় নিষ্পত্তি হয়। ফাইলগুলো নিষ্পত্তির জন্য ফুল কোর্ট সভা হয়নি। এ ছাড়া কিছু বিচারকের বদলি-পদায়ন, বিভাগীয় মামলার অনুসন্ধান, অনুসন্ধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ সংক্রান্ত ফাইল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে জমা পড়েছে। এসব ফাইল সুপ্রিম কোর্টের জিএ কমিটি নিষ্পত্তি করা হলেও তা হয়নি। ফলে অনেক স্টেশনে বিচারক না থাকলেও সেখানে বিচারক পদায়ন হচ্ছে না। আবার বড় ধরনের বিচারক শূন্যতার ফলে তীব্র ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা। অতিরিক্ত কাজের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত বিচারকরাও। সচরাচর একজন বিচারকের দায়িত্বে যে পরিমাণ মামলা থাকার কথা, বাস্তবে তা রয়েছে বহুগুণ বেশি। বিচারকের পদ সৃজন ও শূন্য পদ পূরণের কাজ দ্রুত শেষ হলে বিচার কাজে গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রায় ৬শ বিচারকের পদ শূন্য: সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে মামলাজট চল্লিশ লাখের ওপরে। দিন দিন এ জট বেড়েই চলেছে। একটি মামলার বিচার শেষ হতে বছরের পর বছর এমনকি যুগ পার হচ্ছে। তবু বিচার পাচ্ছেন না বিচারপ্রার্থীরা। অথচ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই। পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগের উদ্যোগ নেই। উপরন্তু বিচার বিভাগে বর্তমানে প্রায় ৬শ বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে জেলা জজের পদ শূন্য রয়েছে প্রায় একশ। সরকার বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন করেছে। কিন্তু সেই আদালতে এখনো বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালতের জন্য জেলা জজ পদমর্যাদার ৭৫টি শূন্য পদসহ প্রায় একশ জেলা জজের পদ শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার ২২-২৩টির মতো পদ শূন্য রয়েছে। যুগ্ম জেলা জজের পদ শূন্য রয়েছে প্রায় দেড়শর মতো। এর মধ্যে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার ও লিগ্যাল এইড অফিসার প্রয়োজন ৫৯ জন। সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ, সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ মর্যাদার পদ শূন্য রয়েছে ২৭০টির মতো। এর বাইরে বাণিজ্যিক আদালতের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পাবেন ৭৫ জন সহকারী জজ। এ ছাড়া আটটি মহানগরীতে সিভিল জজ ও সিনিয়র সিভিল জজ পদমর্যাদার আটজন লিগ্যাল এইড অফিসার প্রয়োজন রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৬ মাস ধরে পঞ্চগড়ের সিজেএম (চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) পদ শূন্য রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও নেই। এ অবস্থায় একজন সিনিয়র সহকারী জজ ভারপ্রাপ্ত সিজেএম (অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার) দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার পক্ষে প্রশাসনিক ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঠাকুরগাঁও জেলায় একজন মাত্র অতিরিক্ত জেলা জজের পদ রয়েছে। সেখানে এ পদটি শূন্য রয়েছে প্রায় এক বছর ধরে। এ জেলার জেলা জজ ছুটিতে গেলে পুরো জেলার বিচার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। একদিকে বিচারকের সংকট রয়েছে বিচার বিভাগে, অন্যদিকে শূন্য পদও পূরণ করা হচ্ছে না। এ কারণে অনেক আদালত চলছে ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে। এর প্রভাব পড়ছে বিচারকাজে। বেশ কয়েকজন বিচারকের অবসর পূর্ব বদলির প্রস্তাব পড়ে আছে। প্রস্তাব অনুমোদনের পূর্বে দু-একজন অবসরেও চলে গেছেন। কিন্তু জিএ কমিটিতে এসব বদলির প্রস্তাব অনুমোদন হয়নি।

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মের অন্যান্য শর্তাবলি) বিধিমালা অনুযায়ী বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন, ছুটি মঞ্জুর ও শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়। এ বিধিমালা অনুযায়ী ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সার্ভিসের সদস্যদের কর্মস্থল নির্ধারণ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও নিয়োগ করে থাকে। এখানে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বলতে রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের ৫৫ (৬) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রণীত রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সার্ভিস প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ জুডিসিয়াল সার্ভিস প্রশাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় হিসেবে আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করে।

জুডিসিয়াল সার্ভিস বিধিমালায় বলা হয়েছে, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ (আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়) সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে, সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, কর্মস্থল নির্ধারণ, পদায়ন, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের কাজ করে থাকে। অর্থাৎ বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিধানের কোনো কাজ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এককভাবে আইন মন্ত্রণালয় করতে পারবে না। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব আকারে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে ফাইল পাঠান। এরপর সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভা ও জিএ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করা হয়। জানা গেছে, বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে ফুল কোর্ট সভা ও জিএ কমিটির বৈঠকের গতি কমেছে। এ সুযোগে অনেক বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের ফাইলের স্তূপ জমেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বের বছরে এ ধরনের ফাইল গেলে দ্রুত জিএ মিটিং করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না। বিপরীতে ফাইল জমা হচ্ছে। তারা আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেড় হাজারের ওপরে বিচারক একযোগে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে বিশাল সংখ্যক বদলির এখন প্রয়োজন নেই। সে কারণে অনেক ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে বদলির সুপারিশ করা হলেও, সেগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের ফাইল নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনেক শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো পদোন্নতি না হওয়া এবং পদায়নে বিলম্বের কারণে বিচারকদের শূন্য পদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী কালবেলাকে বলেন, অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত কার্যক্রম বিচার বিভাগের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। শূন্য পদগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পূরণ করা হবে। বর্তমানে ১৮তম বিজেএসের ভাইভা চলছে; যার মাধ্যমে ২০০ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং ১৯তম বিজেএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত কিছু ফাইল জিএ কমিটি ও ফুলকোর্ট সভার জন্য জমা রয়েছে। এসব কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, শিগগির সম্পন্ন হবে। বিচার প্রশাসনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

জানতে চাওয়া হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের শূন্য পদ তৈরি হয়েছে। বিচারকদের বদলি-পদায়ন-পদোন্নতির প্রয়োজন। সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব আকারে ফাইল পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে সিদ্ধান্ত আসার পর সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘অধস্তন আদালতের ট্রান্সফার বা বিচারকদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের একক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুধু প্রস্তাব পাঠাই। যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অধস্তন আদালতের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিচারককে বদলি করা হয়েছে। এ ১ হাজার ৪০০ বিচারকের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আমলে যারা মোমবাতি জ্বেলে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সাজা দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছিলেন। আমরা সেগুলো ঠিক করতে তাদের বদলির প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু ৭০ শতাংশ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়নি সুপ্রিম কোর্ট থেকে। আসলে মন্ত্রণালয় থেকে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে ও বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।’

আদালত সৃজন হলেও বিচারকের পদ সৃজনে ধীরগতি বিচার বিভাগের পদ সৃজনের ক্ষমতা এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির হাতে। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই জারি করা বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালায় এ বিধান করা হয়। এর আগে, বিচার বিভাগের পদ সৃজনের জন্য প্রথমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হতো। জনপ্রশাসনের অনুমোদনের পর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা সচিব কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। সচিব কমিটির অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে এটি চূড়ান্ত হতো। আর এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হতে মাসের পর মাস এমনকি বছর পেরিয়ে যেত। এখন সরাসরি আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির হাতে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এ সার্ভিস গঠন বিধিমালার ৫(১) বিধি অনুযায়ী বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের কর্মে জ্যেষ্ঠ বিচারপতির সভাপতিত্বে ছয় সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন, হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব/সিনিয়র সচিবদের সমন্বয়ে বিচারিক পদ সৃজন কমিটি গঠিত। বিধিমালা অনুযায়ী, বিচারকদের পদ সৃজনের ক্ষেত্রে এ কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। ৫(২) উপবিধিতে বলা হয়েছে, সার্ভিসের বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষেত্রে বিচারিক পদ সৃজন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে আইন ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্রপতির কাছে সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করবে এবং অনুমোদিত সারসংক্ষেপ অনুযায়ী চূড়ান্ত আদেশ জারি করবে।

এ বিধিমালা জারির মাত্র এক মাসের মাথায় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর এ কমিটি বসে ২৬২ জন বিচারকের পদ সৃজনও করে। কিন্তু বিগত প্রায় এক বছরে কমিটি আর নতুন কোনো পদ সৃজন করেনি বলে সূত্র জানিয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৭শর বেশি কোর্ট সৃজন করা হয়েছে। কোর্ট সৃজন করা হলেও এখনো প্রায় ১৪শ বিচারকের পদ সৃজন করা হয়নি। এর মধ্যে যুগ্ম জেলা জজের ৩৬৭টি, অতিরিক্ত দায়রা জজের ২০৪টি, পারিবারিক আদালতের জন্য ১৬৩টি এবং সিভিল ও সিনিয়র সিভিল জজের ৬৪৮টি পদ সৃজন করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পদ সৃজন করা হলে বিচার কাজে গতি ফেরবে এবং মামলা জট কমাতে ভূমিকা রাখবে।

বিচারক নিয়োগেও ধীরগতি অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগ করে থাকে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন। বর্তমানে ১৮তম বিজেএসের ভাইভা পরীক্ষা চলছে। আগামী মাসে এ ভাইভা পরীক্ষা শেষ হবে। ভাইভা পরীক্ষার পর চূড়ান্ত উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশ হবে। এরপর শুরু হবে তদন্ত ও মেডিকেল। সবকিছু মিলিয়ে এ নিয়োগ শেষ করে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে আরও প্রায় ৬ মাস লেগে যেতে পারে। এ বিজেএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল গত বছরের আগস্টে। একটি বিজেএস শেষ করতেই প্রায় দেড় বছর লেগে যাচ্ছে। এরই মধ্যে গত ২৩ জুলাই ১৯তম বিজেএসের মাধ্যমে ২৫০ বিচারক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, গত জুন মাসে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ২০তম বিজেএসের মাধ্যমে আরও ২০০ বিচারক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারির অনুরোধ জানিয়ে সার্ভিস কমিশনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো ১৯তম বিজেএসের নিয়োগের আবেদনপত্র গ্রহণই শেষ হয়নি। জানা গেছে, কমিশনে লোকবল সংকট রয়েছে। মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা দিয়ে এ বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ ও অধস্তন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা হিমশিম খাচ্ছেন।

ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হয়নি অনেক বিচারকের ২৭০ জন সিভিল জজের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং (বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ) জটের মুখে পড়েছে। এদের মধ্যে অনেকের চাকরির মেয়াদ তিন বছর হতে চলেছে। তারপরও ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হয়নি। ১৫তম বিজিএসে নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির বয়স তিন বছর হতে চলেছে। ১৬ বিজিএসে নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির মেয়াদ ২ বছর হতে চলেছে। আর ১৭ বিজিএস-এ নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির মেয়াদ এক বছর হতে চলেছে। ট্রেনিং ছাড়াই প্রবেশ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব বিচারক বিচার কাজ করে যাচ্ছেন। এর বাইরে যে কোনো স্তরের বিচারকদের পদোন্নতির পর একটা রিফ্রেশার্স ট্রেনিং করানোর কথা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এই ট্রেনিং হচ্ছে না। অনেকে দুই-তিনটি পদোন্নতি পেলেও, তাদের রিফ্রেশার্স ট্রেনিং হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র ৯ জন অফিসার দিয়ে চলছে জুডিশিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটের ছোট একটা বিল্ডিংয়ে দখল করে বসেছে আইন কমিশন ও জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন। জিপি-পিপি ও উকিলদের ট্রেনিংও হচ্ছে না।

বিচারকের তুলনায় মামলার বোঝা কয়েকগুণ বেশি জানা গেছে, অধস্তন আদালতে কর্মরত ২ হাজার ২৩৩ বিচারকের মধ্যে সংযুক্ত আর প্রেষণে রয়েছেন তিন শতাধিক বিচারক। প্রায় দুই হাজার বিচারক মাঠে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ছয়শ বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখের ওপরে। কর্মরত বিচারকের ঘাড়ে গড়ে মামলা প্রায় দুই হাজার। অথচ বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বিচারক প্রতি মামলার সংখ্যা ৮শ থেকে এক হাজার হওয়া উচিত বলে মতামত দেওয়া হয়েছে।

একদিকে এ বিপুলসংখ্যক মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা খুবই কম, অন্যদিকে জনসংখ্যা অনুপাতেও দেশে বিচারকের সংখ্যা কম। দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এ সংখ্যাকে বর্তমানে বাংলাদেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে বিদ্যমান বিচারকের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে দেখা যায়, প্রায় ৯০ হাজার মানুষের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় নিতান্তই কম। যুক্তরাজ্যে আনুমানিক ৩ হাজার ১৮৬ জনের বিপরীতে একজন বিচারক; যুক্তরাষ্ট্রে এটি প্রতি ১০ হাজারে একজন; ভারতে ৪৭ হাজার ৬১৯ জনে একজন এবং পাকিস্তানে প্রায় ৫০ হাজারে একজন বিচারক রয়েছেন। বিচারকের স্বল্পতার দিক বিবেচনায় অনেক আগেই আইন কমিশন দ্রুত আরও ২ হাজার ৪০০ বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সে সুপারিশ তখনকার সরকার আমলে নেয়নি। ফলে বিচার বিভাগে বিচারক সংকট রয়ে গেছে।

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘১৮শ-১৯শ বিচারক দিয়ে ১৮ কোটি লোকের দেশে ন্যায়বিচার ও সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অধস্তন আদালতে ৪০ লাখের ওপরে মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরমে। সে ব্যাপারে কারও কোনো নজরদারি আছে বলে মনে হয় না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অনিয়ম-দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতা। বিচারকের পদ সৃজন ও শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ দেশের মানুষের নিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত। যেদেশে এত লাখ লাখ মামলার জট জমে আছে, সেদেশের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব নয়। এসব ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা যাদের আছে তাদের মনোযোগী হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’